২৭ হাজারের ওষুধ মিলবে সাধ্যের মধ্যে! ক্যানসারের ১১০টি ওষুধের দাম কমাতে বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের

Cancer drugs to get 70% cheaper as centre plans to cap trade margins (Image: Pexels/@Tima Miroshnichenko)

ক্যানসার মানেই এক দিকে দুরারোগ্য অসুখের শারীরিক যন্ত্রণা, অন্য দিকে চিকিৎসার বিপুল খরচ জোগাতে গিয়ে রোগীর পরিবারের সর্বস্বান্ত হওয়ার দশা। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সেই গভীর সংকটে এবার মস্ত বড় স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসছে কেন্দ্রীয় সরকার। এক ধাক্কায় প্রায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে চলেছে ক্যানসারের ওষুধের (anti-cancer drugs) খুচরো দাম। ওষুধের পাইকারি সরবরাহকারী ও খুচরো বিক্রেতাদের অতিরিক্ত মুনাফায় রাশ টানতেই এই পদক্ষেপ। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওষুধের বাণিজ্যিক মার্জিনে (trade margin) সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়া হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সার ও রাসায়নিক মন্ত্রকের অধীনস্থ ফার্মাসিউটিক্যালস বিভাগ (Department of Pharmaceuticals) আগামী দশ দিনের মধ্যেই এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারে। নতুন এই নিয়মের আওতায় আসছে ১১০টি গুরুত্বপূর্ণ ক্যানসাররোধী ওষুধ, যার মধ্যে অন্তত ৩৫টি পেটেন্টযুক্ত ওষুধও (patented medicines) রয়েছে।

বছরে ২৫০০ কোটি টাকার সাশ্রয়


 এত দিন পর্যন্ত ক্যানসারের একাধিক ওষুধের ক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক সংস্থার খরচের সঙ্গে খোলা বাজারের বিক্রয়মূল্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক থাকত। নতুন নির্দেশিকায় স্পষ্ট করা হয়েছে, দেশি হোক বা বিদেশি, ব্র্যান্ডেড হোক বা জেনেরিক (branded and generic)– সব ধরনের নন-শিডিউলড ক্যানসারের ওষুধের ক্ষেত্রেই ট্রেড মার্জিনের এই ৩০ শতাংশের সিলিং কার্যকর হবে।

সরকারি সূত্রের হিসেব অনুযায়ী, বাণিজ্য মার্জিনে এই লাগাম টানার ফলে গোটা দেশে ক্যানসার রোগীদের বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। জীবনদায়ী ওষুধের জোগান যাতে কোনও ভাবেই ব্যাহত না হয়, আবার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেও থাকে– সেই ভারসাম্য বজায় রাখতেই এই নীতি কার্যকর করা হচ্ছে।

২৭০০ টাকার ওষুধ বিক্রি ২৭ হাজারে! সুপ্রিম তোপ

 ক্যানসারের ওষুধ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীদের বেপরোয়া মুনাফা লোঠার এই ছবি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এনেছিল সুপ্রিম কোর্ট। গত ২৯ সেপ্টেম্বর বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চে এই সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি চলাকালীন আদালত রীতিমতো ক্ষোভ প্রকাশ করে।

শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, এটি সাধারণ ব্যবসা নয়, একে প্রকাশ্য ‘লুঠপাট’ বা ধ্বংসলীলা (carnage) বলা চলে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার উদ্দেশে ডিভিশন বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে, যে ওষুধ পাইকারি ডিস্ট্রিবিউটর বা রিটেলারের কাছে মাত্র ২,৭০০ টাকায় পৌঁছচ্ছে (Price to Retailer-PTR), তার সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য বা এমআরপি (MRP) ছাপা হচ্ছে ২৭,০০০ টাকা! কী করে এক লাফে দশ গুণ দাম বাড়িয়ে রোগীদের থেকে টাকা আদায় করা যেতে পারে? শুধু তা-ই নয়, সরকারি স্বাস্থ্যবিমার আওতায় সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কর্পোরেট হাসপাতালগুলি কেন রোগীদের তাদের নিজস্ব ফার্মেসি থেকেই চড়া দামে ওষুধ কিনতে বাধ্য করে, তা নিয়েও তীব্র প্রশ্ন তুলেছিল আদালত। সব ধরনের ওষুধের ক্ষেত্রে এক রকম ১৬ শতাংশ মার্জিন রাখার ভাবনা নিয়েও কেন্দ্রকে খতিয়ে দেখতে বলা হয়।

কেন এই নীতি জরুরি?

ভারতে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে থেরাপি ও ওষুধের উন্নতি হলেও তার আকাশছোঁয়া খরচ সাধারণ পরিবারের পক্ষে বহন করা কার্যত অসম্ভব। চিকিৎসার এই অনিয়ন্ত্রিত খরচকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় আর্থিক বিষক্রিয়া বা ফিনান্সিয়াল টক্সিসিটি (financial toxicity)। ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত দামের জেরে অনেকেই মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

যদিও সরকারি কর্তাদের দাবি, আদালতের সাম্প্রতিক মন্তব্যের আগেই ২০১৯ সাল থেকে এই ‘ট্রেড মার্জিন রেশনালাইজেশন’ (trade margin rationalization) প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ চালাচ্ছিল স্বাস্থ্য দফতর। একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি ইতিমধ্যেই ওষুধের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করেছে।

কবে থেকে কম দামে ওষুধ?

 সরকারি ছাড়পত্র মিললেই এই ১১০টি ক্যানসারের ওষুধের নতুন দাম কার্যকর হবে। খোলা বাজারের ওষুধের দোকানের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালের ফার্মেসিগুলিকেও এই নতুন দামের তালিকা কঠোর ভাবে মেনে চলতে হবে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে তা দেশের ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক মোড় হতে চলেছে। জীবনদায়ী ওষুধ সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে এলে বহু পরিবারকে আর চিকিৎসার খরচের দায়ে সর্বস্বান্ত হতে হবে না।