কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির মিলিত চেষ্টায় সাফল্যের নজির গড়ল আধুনিক প্রযুক্তি। অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস হল একটি নিউরনজনিত রোগ, যা মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডকে প্রভাবিত করার ফলে পেশীর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। এটি হাঁটা-চলায়, গিলতে এবং নড়াচড়া করতেও অসুবিধা সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে রোগীর শ্বাস কষ্ট হয়। এতদিন মনে করা হয়েছে এই রোগের কোন প্রতিকার নেই। এবার সেই ক্ষেত্রে সাফল্য পেলেন চিকিৎসকেরা।
অ্যামিওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস রোগের কারণ এখনও অজানা। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে এই রোগ প্রবাহিত হয়। তবে এই রোগ সংক্রামক নয়। এই রোগ রোগীর মানসিক ক্ষমতা এবং ইন্দ্রিয়, যেমন শ্রবণ ক্ষমতা বা দৃষ্টিশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে না। তবে চিকিত্সায় দেখা গিয়েছে, এর উপসর্গগুলি একটি নির্দিষ্ট মাত্রা পর্যন্ত কমে যেতে পারে এবং এএলএস রোগীদের জীবনকাল দীর্ঘায়িত করতে সাহায্য করে থাকে। এই রোগটি ‘লু গেহরিগ ডিজিজ’ নামেও পরিচিত।
যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ব্র্যাড স্মিথ ৩৭ বছর বয়সে এই জটিল স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হন। ধীরে ধীরে তিনি নিজের শরীর নড়াচড়া করার এবং কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। তবে তাঁর মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ সচল ছিল। ফলে তিনি সবকিছু বুঝতে পারলেও, নিজের ভাব প্রকাশ করতে পারতেন না।
সম্প্রতি নিউরালিংক-এর তৈরি একটি ব্রেন চিপ তাঁর মস্তিষ্কে বসানো হয়। এই চিপটি একটি ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস হিসেবে কাজ করে। এটি মস্তিষ্কের সিগন্যাল পড়ে তা কম্পিউটারের নির্দেশে রূপান্তর করে। ফলে স্মিথ এখন শুধু চিন্তা করেই কম্পিউটারের কার্সার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং বার্তা টাইপ করতে পারেন। শুধু তাই নয়, ইলেভেনল্যাবস্-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁর পুরনো কণ্ঠস্বরও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এখন তিনি টাইপ করলে, কম্পিউটার তাঁর নিজের কণ্ঠস্বরেই কথা বলে।
এর আগে তিনি আই-ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে যোগাযোগ করতেন, যা ছিল অত্যন্ত ধীর এবং কষ্টসাধ্য। কিন্তু নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে তাঁর যোগাযোগ এখন অনেক দ্রুত ও সহজ হয়েছে। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠিত নিউরালিঙ্কের তৈরি এই ব্রেন ইমপ্লান্টের কল্যাণে স্মিথ এখন কম্পিউটার কার্সার নিয়ন্ত্রণ করতে, বার্তা টাইপ করতে, ভিডিও তৈরি করতে এবং এমনকি নিজের কণ্ঠস্বরের একটি এআই-নির্মিত সংস্করণ ব্যবহার করে কথা বলতে পারেন। তিনি পরিবারের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন।
শুধু তাই নয়, তিনি তাঁর সন্তানদের সঙ্গে ভিডিও গেমও খেলছেন। এক সময় হাসি-ঠাট্টা, খেলাধুলা আর আলাপচারিতায় পরিপূর্ণ জীবন যা একদিন ব্র্যাড স্মিথ চিরতরে হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে করা হচ্ছিল তা আবার ফিরে এসেছে এই উন্নত প্রযুক্তির হাত ধরে। আজ, ৪৫ বছর বয়সে তাঁর জীবনটা আমূল বদলে গিয়েছে।
এই ডিভাইসটি একটি ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা বিসিআই হিসেবে কাজ করে। এটি স্নায়বিক সংকেত ধরতে পারে এবং সেগুলোকে ডিজিটাল নির্দেশে রূপান্তরিত করে।
সহজ কথায়, স্মিথ যদি কোনও একটি নির্দিষ্ট কাজের কথা ভাবেন, কম্পিউটারটি তাতে সাড়া দেয়। এভাবেই মানুষ আর প্রযুক্তির যৌথ সহযোগিতায় অসম্ভব একদিন সম্ভব হয়ে ওঠে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাফল্য ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। যদিও এই প্রযুক্তি এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে, তবুও ভবিষ্যতে পক্ষাঘাত বা স্নায়ুরোগে আক্রান্ত রোগীদের জীবনে এটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে হারানো ক্ষমতাও একদিন ফিরে পাওয়া সম্ভব।