সাবধান, রাতে ঘরে শুয়েও হতে পারে হিট স্ট্রোক

প্রতীকী চিত্র

বৈশাখের দহনজ্বালায় কেবল রাস্তাঘাট নয়, এখন ঘরের চার দেওয়ালও যেন আগুন ছড়াচ্ছে। রাজধানী দিল্লিতে তাপমাত্রা ৪২ ছাড়িয়েছে। দক্ষিণবঙ্গও কিছু কম যায় না। দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে তাপপ্রবাহের দাপটে মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বাইরে বেরোলেই রোদের তেজ, আর ঘরে ফিরলেও মিলছে না স্বস্তি। অনেকেই মনে করেন, হিট স্ট্রোক মানেই দিনের বেলায় কড়া রোদে দীর্ঘক্ষণ থাকা। কিন্তু চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন— এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। দিনের বেলায় যেমন, তেমনই রাতেও, এমনকি ঘরের মধ্যে শুয়ে থাকলেও হিট স্ট্রোক হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিট স্ট্রোক কেবল সূর্যের তাপের কারণে হয় না। অতিরিক্ত গরম, উচ্চ আর্দ্রতা, বদ্ধ ঘর এবং বায়ু চলাচলের অভাব— এই সব মিলিয়েই শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ফলে শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। যখন শরীর সেই অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করতে পারে না, তখনই শুরু হয় বিপদ। এই অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হতে পারে, যা প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষায়, হিট স্ট্রোকের উপসর্গ অনেক সময় প্রথমে সাধারণ দুর্বলতার মতো মনে হলেও তা দ্রুত মারাত্মক আকার নিতে পারে। মাথা ঘোরা, তীব্র মাথাব্যথা, বুকে চাপ লাগা, হাত-পা অবশ হয়ে আসা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, অতিরিক্ত ঘাম অথবা হঠাৎ ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া— এসবই বিপদের সংকেত। অনেক ক্ষেত্রে রোগী দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না, হঠাৎ বসে পড়েন বা অজ্ঞান হয়ে যান। রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং স্নায়বিক সমস্যা দেখা দেওয়াও অস্বাভাবিক নয়।


সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হল, রাতের বেলাতেও হিট স্ট্রোক হতে পারে। বিশেষ করে যেসব ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল নেই, সিলিং ফ্যান বা কুলিং ব্যবস্থা কার্যকর নয়, সেখানে দীর্ঘ সময় কাটালে শরীরে তাপ জমতে থাকে। শোবার সময়ও যদি ঘর অত্যন্ত গরম ও আর্দ্র থাকে, তবে শরীর বিশ্রাম না পেয়ে বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আক্রান্ত ব্যক্তিকে অবিলম্বে ঠান্ডা বা বায়ু চলাচলযুক্ত স্থানে নিয়ে যেতে হবে। সম্ভব হলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে রাখা ভালো। পোশাক আলগা করে দিতে হবে এবং চোখ-মুখে ঠান্ডা জলের ঝাপ্টা দিতে হবে। শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করতে হবে, তবে বরফজল সরাসরি ব্যবহার না করাই ভালো। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

প্রতিরোধই এখানে প্রধান অস্ত্র। দুপুরের কড়া রোদ এড়িয়ে চলা, বাইরে বেরোলে ছাতা ব্যবহার, মাথা ও মুখ ঢেকে রাখা, এবং শরীরে পর্যাপ্ত জল বজায় রাখা জরুরি। শুধু জল নয়, ওআরএস মিশ্রিত জল বা লবণ-চিনির সুষম পানীয় শরীরের ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য রক্ষা করে। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং শারীরিকভাবে দুর্বল ব্যক্তিদের নিয়মিত জল খাওয়ানো প্রয়োজন।

এসি ঘর থেকে বেরিয়ে হঠাৎ রোদে চলে যাওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে। শরীরকে বাইরের তাপমাত্রার সঙ্গে মানিয়ে নিতে কয়েক মিনিট সময় দেওয়া উচিত। যাঁদের বাইরে কাজ করতে হয়, তাঁদের একটানা কাজ না করে মাঝেমধ্যে ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া দরকার।

এই তীব্র গরমে হিট স্ট্রোক আর কেবল দিনের সমস্যা নয়। রাতের অন্ধকারেও তার থাবা নামতে পারে। তাই সচেতন থাকাই এখন বাঁচার সবচেয়ে বড় উপায়।