ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রোজ রোজ ইনসুলিনের সূচ ফোটানোর ঝক্কি এবার কমতে পারে। ডেনমার্কের ওষুধ সংস্থা নোভো নরডিস্ক (Novo Nordisk) ভারতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাজারে নিয়ে এসেছে তাদের সপ্তাহে একবার নেওয়ার ইনসুলিন আউইক্লি (Awiqli)। বুধবার রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ভারতে ক্রমবর্ধমান ডায়াবেটিসের সমস্যা রুখতেই এই ওষুধ বাজারে আনা হয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক টাইপ ১ (Type 1) এবং টাইপ ২ (Type 2), দুই ধরনের ডায়াবেটিস রোগীদের জন্যই এই ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন মিলেছে বলে জানা যাচ্ছে।
কী এই আউইক্লি, কীভাবে কাজ করে
আউইক্লির মূল উপাদান ইনসুলিন আইকোডেক (insulin icodec)। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বেসাল ইনসুলিন (basal insulin), যা রক্তে মিশে সপ্তাহজুড়ে ধীরে ধীরে কাজ করে। সাধারণ বেসাল ইনসুলিন রোজ নিতে হয়, কিন্তু আইকোডেক শরীরের প্রোটিন অ্যালবুমিনের (albumin) সঙ্গে যুক্ত হয়ে ধীরে নিঃসৃত হয়, ফলে একবার নিলেই তা সাত দিন সক্রিয় থাকে। আউইক্লি ফ্লেক্সটাচ (FlexTouch) নামের একটি প্রি-ফিলড পেনের মাধ্যমে দেওয়া হয়, যেখানে ডোজ ১০ ইউনিট করে বাড়ানো যায়, সর্বোচ্চ ৭০০ ইউনিট পর্যন্ত। যাঁরা প্রথমবার ইনসুলিন নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য সাপ্তাহিক শুরুর ডোজ সাধারণত ৭০ ইউনিট। কোনও কারণে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে নিতে ভুলে গেলে চার দিনের মধ্যে সেই ডোজ নেওয়া যায়, তারপর ফের নিয়মিত সাপ্তাহিক সূচিতে ফেরা যায়।
সাত ইনজেকশন এখন একটায়
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ইনসুলিন থেরাপির অন্যতম বড় বদল। নোভো নরডিস্কের ONWARDS নামের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল প্রোগ্রামে প্রায় ২,৬৮০ জন টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর উপর আউইক্লি পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, দৈনিক বেসাল ইনসুলিনের তুলনায় এটি রক্তে শর্করার মাত্রা (HbA1c) নিয়ন্ত্রণে সমান বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে বেশি কার্যকর। রোগীকে দৈনিক ইঞ্জেকশনের ঝক্কি নিতে হবে না। সপ্তাহে একবার মাত্র সূচ ফোটালেই হবে। এই সরলীকরণকেই সবচেয়ে বড় সুবিধা হিসেবে তুলে ধরছে সংস্থা। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিশেষত যাঁরা দীর্ঘদিন ইনসুলিন নিতে ভয় পান বা নিয়মিত ইনজেকশন নেওয়ায় গাফিলতি করেন, তাঁদের চিকিৎসায় ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এই ওষুধ সহায়ক হতে পারে।
টাইপ ১ ও টাইপ ২, দুই ক্ষেত্রেই ছাড়পত্র
আমেরিকার ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফডিএ (FDA) গত মার্চে আউইক্লিকে শুধু টাইপ ২ ডায়াবেটিসের জন্য অনুমোদন দিয়েছিল। কারণ টাইপ ১ ডায়াবেটিসে এর সুরক্ষা নিয়ে তথ্য পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করেছিল এফডিএ-র বিশেষজ্ঞ প্যানেল। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও সুইৎজারল্যান্ডে আউইক্লি টাইপ ১ ও টাইপ ২, দুই ধরনের ডায়াবেটিসেই ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে। ভারতে লঞ্চের ক্ষেত্রে টাইপ ১ ও টাইপ ২ উভয় রোগীর কথাই বলা হচ্ছে, অর্থাৎ ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এক্ষেত্রে ইউরোপীয় ধাঁচের বিস্তৃত অনুমোদনের পথে হেঁটেছে বলেই মনে হচ্ছে। প্রসঙ্গত, ইনসুলিন আইকোডেককে ভারতে গত বছরই নিয়ন্ত্রক ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল, বাজারে আসতে লেগে গেল আরও কিছুটা সময়।
বাংলার ডায়াবেটিস-চিত্র কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
এই লঞ্চের গুরুত্ব পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে আরও বেশি। আইসিএমআর (ICMR) ও মাদ্রাজ ডায়াবেটিস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে প্রায় ১০ কোটি ১০ লক্ষ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যার মধ্যে প্রায় ৯ লক্ষ মানুষ টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ভুগছেন, এবং তার একটা বড় অংশই ১৮ বছরের কম বয়সি। ন্যাশনাল আরবান ডায়াবেটিস সার্ভে অনুযায়ী কলকাতায় ডায়াবেটিস আক্রান্তের হার প্রায় ১২ শতাংশ, হাওড়ায় তা ১৩.২ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলে, যা রাজ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ। আইআইটি খড়্গপুরের একটি সমীক্ষা বলছে, গ্রামীণ বাংলাতেও ডায়াবেটিসের হার এখন ৩.৫ থেকে ৫.৭ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, যা কয়েক দশক আগেও ভাবা যেত না। কলকাতার আইপিজিএমইআর এবং এসএসকেএম হাসপাতালের (IPGMER & SSKM Hospital) এন্ডোক্রিনোলজি বিভাগও দেশের বৃহৎ আইসিএমআর-ইন্ডিয়ার সমীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, অর্থাৎ বাংলার চিকিৎসক ও গবেষকরা দেশের ডায়াবেটিস-চিত্র তৈরিতে সরাসরি যুক্ত। এই পরিসংখ্যানের নিরিখে সপ্তাহে একবারের ইনসুলিন শুধু সুবিধার প্রশ্ন নয়, রাজ্যের বিশাল সংখ্যক রোগীর চিকিৎসা-ধারাবাহিকতার প্রশ্নও বটে।
দাম কত?
ভারতে আউইক্লির সরকারি দাম এখনও নোভো নরডিস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। লঞ্চের আগে ওষুধ আমদানির সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সূত্রের মাধ্যমে (named patient programme-এর মাধ্যমে) যে দাম শোনা যাচ্ছিল, তা পেন প্রতি প্রায় ৩০ হাজার টাকার আশপাশে। তবে এটি অনিয়ন্ত্রিত আমদানির হিসেব, বাজারে আনুষ্ঠানিক লঞ্চের পরের দাম এর চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। তাই এই মুহূর্তে চূড়ান্ত দাম নিয়ে নির্দিষ্টভাবে কিছু বলা সমীচীন নয়। দাম ও প্রেসক্রিপশন সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্তের জন্য নিজের চিকিৎসকের পরামর্শই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পথ।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও সতর্কতা
অন্য যে কোনও ইনসুলিনের মতোই আউইক্লির ক্ষেত্রেও হাইপোগ্লাইসেমিয়া বা রক্তে শর্করা অতিরিক্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া ইনজেকশনের জায়গায় প্রতিক্রিয়া, চামড়া মোটা বা গর্ত হয়ে যাওয়া (লাইপোডিস্ট্রফি), চুলকানি, র্যাশ, হাত-পা ফুলে যাওয়া এবং ওজন বৃদ্ধির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যেতে পারে বলে সংস্থার তথ্যে বলা হয়েছে। দৈনিক ইনসুলিন থেকে সাপ্তাহিক আউইক্লিতে বদলের সময় প্রথম কয়েক সপ্তাহ রক্তের শর্করা নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি বলে চিকিৎসকরা পরামর্শ দিচ্ছেন। পেন সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন, ব্যবহারের আগে পর্যন্ত তা ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ফ্রিজে রাখতে হয়, একবার ব্যবহার শুরু হলে সাধারণ তাপমাত্রায় সর্বোচ্চ ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত রাখা যায়, তবে জমিয়ে বরফ করে ফেলা চলবে না।
বিশ্ববাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
সপ্তাহে একবারের ইনসুলিনের বাজারে নোভো নরডিস্ক একা নেই। আমেরিকার সংস্থা ইলাই লিলিও (Eli Lilly) নিজস্ব সাপ্তাহিক ইনসুলিন এফসিটোরার (Efsitora) উপর কাজ করছে, যার ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল ইতিমধ্যেই দ্য ল্যানসেট (The Lancet) ও নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনে (New England Journal of Medicine) প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ, আগামী দিনে ভারতের বাজারেও একাধিক সাপ্তাহিক ইনসুলিনের মধ্যে প্রতিযোগিতা দেখা যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দাম ও সরবরাহ… দুই দিক থেকেই রোগীদের জন্য ভালো খবর হতে পারে।