২৭ বছরের তরুণ। সামনে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন, ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। কিন্তু হঠাৎ একদিন খিঁচুনি সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। তড়িঘড়ি হাসপাতালে ভর্তি। একের পর এক পরীক্ষা শেষে স্ক্যান রিপোর্টে ধরা পড়ে উদ্বেগজনক তথ্য— মস্তিষ্কের এমন এক গভীর অংশে সমস্যা, যেখান থেকে মানুষের কথা বলা, স্মৃতিশক্তি, কণ্ঠস্বর, খাবার গেলা, হাঁটা এমনকি গান গাওয়ার ক্ষমতাও নিয়ন্ত্রিত হয়। সেই অংশে অস্ত্রোপচার মানেই ছিল এক বড় ঝুঁকি। সামান্য ভুলেই হারিয়ে যেতে পারত কথা বলার ক্ষমতা, বদলে যেতে পারত পরিচয়।
রোগ নির্ণয় ও স্নায়বিক মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন নিউরোলজিস্ট ডা. দীপ দাস। তাঁর পরামর্শে চিকিৎসক দল সিদ্ধান্ত নেয়— অস্ত্রোপচার হবে রোগীকে জাগিয়ে রেখেই। অর্থাৎ অচেতন না করেই ব্রেন সার্জারি। এই জটিল দায়িত্ব নেন সিএমআরআই হাসপাতালের নিউরোসার্জন ডা. রথিজিৎ মিত্র। অ্যানেস্থেসিয়ার দায়িত্বে ছিলেন ডা. শৈলেশ কুমার।
তবে এই অস্ত্রোপচারের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং মানবিক দিক ছিল স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট সমীর কুশালির উপস্থিতি। অস্ত্রোপচারের অনেক আগেই তিনি রোগীর ভাষা, স্মৃতি, কণ্ঠস্বর ও খাবার গেলার ক্ষমতার বিস্তারিত মূল্যায়ন করেন। শুধু চিকিৎসা নয়, মানসিক দিক থেকেও রোগীকে প্রস্তুত করেন তিনি। বোঝান— ‘অপারেশনের সময় আপনার কথা বলা আর সাড়া দেওয়াই আপনাকে আগের মতো থাকতে সাহায্য করবে।’
অস্ত্রোপচারের দিন দৃশ্যটি ছিল ব্যতিক্রমী। অপারেশন টেবিলে রোগী সম্পূর্ণ সচেতন। তাঁকে বিভিন্ন শব্দ উচ্চারণ করতে বলা হচ্ছে, ছোট বাক্য গঠন করতে বলা হচ্ছে, কখনও গান গাইতেও অনুরোধ করা হচ্ছে। প্রতিটি প্রতিক্রিয়া গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছেন স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্ট। সামান্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পেলেই তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হচ্ছে নিউরোসার্জনকে। সেই অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের পথ ও কৌশল বদলানো হচ্ছে। অস্ত্রোপচারের মাঝেই রোগী গান গেয়ে ওঠেন— যা তাঁর কণ্ঠস্বর ও স্মৃতিশক্তি অক্ষুণ্ণ থাকার প্রমাণ দেয়।
অস্ত্রোপচারের ফল ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। কয়েক দিনের মধ্যেই রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেন। কথা বলা, স্মৃতিশক্তি, খাবার গেলা— সবই স্বাভাবিক। হাঁটাচলা কিংবা গান গাওয়াতেও কোনও সমস্যা নেই।
চিকিৎসকদের মতে, উন্নত দেশগুলিতে জেগে থেকে ব্রেন সার্জারি ও দলগত চিকিৎসা পদ্ধতি ধীরে ধীরে নিয়মিত হলেও ভারতে এখনও তা বিরল। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, ব্রেন সার্জারির মতো সূক্ষ্ম চিকিৎসায় স্পিচ ল্যাঙ্গুয়েজ প্যাথোলজিস্টকে অপারেশন দলের মূল অংশ হিসেবে যুক্ত করলে শুধু প্রাণ বাঁচে না, বেঁচে থাকে মানুষের ভাষা ও পরিচয়ও।
এই ঘটনা তাই শুধু একটি সফল অস্ত্রোপচারের খবর নয়— এটি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিরও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। কারণ চিকিৎসার লক্ষ্য শুধু জীবন রক্ষা নয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ও আত্মপরিচয়কে অক্ষুণ্ণ রাখা।