অর্কপ্রভ দাস: ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া অ্যামাজন প্রাইমের একটি জনপ্রিয় হলিউড ওয়েব সিরিজ Jack Ryan season 2- তে দেখানো হয়েছিল কীভাবে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে সিক্রেট মিশন চালিয়ে প্রেসিডেন্ট বধ করে ভেনেজুয়েলার জনগণকে গণতন্ত্র উপহার দিচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
আর ২০২৬-এর শুরুতেই Operation Absolute Resolve, এর মাধ্যমে কার্যত সেই রিল লাইফকে রিয়েল লাইফে পরিণত করে দেখালেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।আর সেই সঙ্গে ট্রাম্প প্রমাণ করে দিলেন নতুন বছরেও বিশ্ববাসীকে হতাশ করবেন না তিনি। শান্তিতে নোবেল জয়ের প্রচেষ্টা তিনি চালিয়ে যাবেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির দুনিয়ায় ভালো খারাপ বলে কিচ্ছু হয় না। আদতে জোর যার মুলূক তার। ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে আচমকা মার্কিন হানা এবং সস্ত্রীক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অপহরণ কার্যত এটাই প্রমাণ করে ।
UNO যথারীতি বোবার শত্রু নেই নীতিতে বিশ্বাসী। আমেরিকার জান্তব আগ্রাসনের সামনে সে বরাবরই নিজেকে নির্বিষ ঢ়োঁড়া সাপ প্রমাণ করেছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার ভেনেজুয়েলার বিরোধীনেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার মধ্যেই ট্রাম্প যেন তার পক্ষে আন্তর্জাতিক মহলের এক নীরব সম্মতি পেয়েছিলেন। ট্রাম্পের অভিযোগ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আসলে মাদক সন্ত্রাসে যুক্ত , তিনি মাদক কারবারিদের সর্দার। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানকে অপর একটি দেশ এভাবে আচমকা হামলা চালিয়ে অপহরণ করতে পারে কী? পৃথিবীর কোন আইনে এটি সমর্থিত?
মার্কিন সরকারই বলুন বা ডিপ স্টেটই বলুন এদের পরিকল্পনা কিন্তু খুব পরিষ্কার। যে দেশে যেমন সরকারই থাকুক না কেন, সে গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র বা স্বৈরতন্ত্র যাই হোক আমেরিকার কাছে মাথা নত না করলেই তার উপর হামলা হবে। আর সেই দেশটি যদি একটু সামরিক ভাবে দূর্বল হয়, তেল বা অন্যান্য খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ হয় কিংবা অবস্থানগত কারণে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয় তাহলে তো কথাই নেই।
আর সেখানে আমেরিকার নাকের ডগায় ভেনেজুয়েলার মত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ খনিজ তেলের ভান্ডার থাকা দেশটি কোন সাহসে আমেরিকার বিরুদ্ধাচরণ করে?অতএব নতুন বছরে যে দেশটির উপর গণতন্ত্র বর্ষিত হল সেই দেশটি হল ভেনেজুয়েলা। অবশ্য ইতিমধ্যেই ভেনেজুয়েলার সরকার তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়বে না দীর্ঘমেয়াদী গৃহযুদ্ধের দিকে সে দেশে এগিয়ে যাবে তা অবশ্যই সময় বলবে।
তবে প্রথমটি ঘটার সম্ভবনাই বেশি। কারণ সোভিয়েত পরবর্তী যুগে বিশ্বে তথাকথিত সুপার পাওয়ার এখনও পর্যন্ত যে কেবল একটিই আছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারংবার প্রমাণ করেছে। তেতো সত্যি হল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর ক্ষমতা চিন বা রাশিয়া এখনও পর্যন্ত কারুর নেই। চিন সামরিক এবং আর্থিক ক্ষেত্রে যতই অগ্রগতি করুক না কেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও তার ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আর রাশিয়া পেশীশক্তিতে আমেরিকাকে টক্কর দিতে কিছুটা সক্ষম হলেও আর্থিক শক্তিতে অনেক অনেক পিছিয়ে। আর এযুগে যুদ্ধ অতীব ব্যয়বহুল বিষয়। ইউক্রেন সমস্যা না মিটলে অন্য দিকে নজর দেওয়ার সাধ বা সাধ্য কোনটিই তাদের নেই।তাই কোন দেশ ভেনেজুয়েলাকে সমর্থন করল, কী করল না, তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কিচ্ছু যায় আসে না। একমাত্র ভিয়েতনাম ছাড়া মার্কিনীদের সঙ্গে লড়াই করে টিকেছে এরকম উদাহরণ কিন্তু খুব একটা নেই।
আফগানিস্তানের ড. নাজিবুল্লাহ, ইরাকের সাদ্দাম হুসেন, লিবিয়ার গদ্দাফি সকলের ক্ষেত্রেই প্রায় একই ঘটনা । রাশিয়া এবং ইরানের প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয় সমর্থন পেয়েও টিকতে পারেননি সিরিয়ার বাসার আল আসাদ। ইরানের আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের গদির দিকেও তীব্র নজর পড়েছে ডনের। তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভুলে গেলে চলবে না পাকিস্তানের ইমরান খান একাধিকবার তার পরিণতির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই আঙুল তুলেছেন।
তবে হ্যাঁ, এতকিছুর মধ্যেও সাম্প্রতিক কালে আমেরিকার মুখ কিছুটা পুড়েছিল আফগানিস্তানে তার পুরাতন মিত্র তালিবানদের হাতে। সেখানে হয়ত মার্কিন ডিপ স্টেট কিছুটা হিসাবে গোলমাল করেছে। কিংবা তারা চেয়েছে অহেতুক লাভহীন কিন্তু ব্যয়বহুল যুদ্ধ চালিয়ে আফগানিস্তানে গণতন্ত্র রাখার কোনও মানেই নেই। অতএব আচমকা রণে ভঙ্গ দেওয়াই শ্রেয়।
তবে আরেকজনের উল্লেখ এখানে না করলেই নয় তিনি অবশ্যই উত্তর কোরিয়ার কিম জং উন। পারমাণবিক অস্ত্র এবং সেই অস্ত্রকে মার্কিন ভুখন্ডে পৌঁছে দেওয়ার মত সুদীর্ঘ পাল্লার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল বা ICBM রয়েছে কিমের অস্ত্র ভান্ডারে। তাই কিমের দেশ উত্তর কোরিয়ার উপর ভেনেজুয়েলা মডেলে কোনও রকম হামলা হলে তিনি যে তৎক্ষণাৎ পারমাণবিক প্রত্যাঘাত করবেন সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আর কিম জং উন সাদ্দাম হুসেনের মত দুর্ভাগাও নন যে Weapon of Mass Destruction রাখার মিথ্যা বদনাম নিয়ে চুপচাপ ফাঁসিতে লটকে পড়বেন। তথাকথিত মার্কিন ডিপ স্টেট এই কথাটি খুব ভালোমতন বোঝে।তাই উত্তর কোরিয়ার জনগণকে গণতন্ত্র উপহার দেওয়ার কাজটা বেশ কঠিন বৈকি ।ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যত কী হবে তা সময় বলবে।
তবে ইউএস স্পেশাল ফোর্সের হাতে বন্দি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ছবি দেখে মার্কিন সেনার হাতে বন্দি আরেক রাষ্ট্রপ্রধানের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি পানামার সামরিক শাসক ম্যানুয়েল অ্যান্টোনিও নোরেইগা। তিনিও মার্কিন সেনার হাতে বন্দি হন এবং তাঁকেও অনেকটা একই কায়দায় মার্কিন সামরিক বিমানে তোলা হয়। তবে কাকতালীয় কি না জানি না ১৯৯০ সালের ওই দিনটিও ছিল ৩ জানুয়ারি।