লিটল ম্যাগাজিন: আঁতুড় নয়, ‘লেখকের ভদ্রাসন

মৌলিনাথ বিশ্বাস: পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির ৫ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ২০ মে ১৯৯১ তারিখে ইতিহাসবেত্তা-রাজনীতিবিদ-লেখক হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় একটি বিশেষ অভিভাষণ দেন। শিরোনাম ছিল ‘বাংলা আকাদেমির কাছে প্রত্যাশা ও প্রস্তাব’। ( আচ্ছা, এই ভাষণটা কি বন্ধ হয়ে গিয়েছে?)। সে যাই হোক, সেই বক্তব্যে হীরেন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলছেন, “ লিটল ম্যাগাজিন নামে পরিচিত পত্রিকার সংখ্যা এখন কম নয়, মাঝে মাঝে উদ্যোক্তাদের উদ্দীপনা ও অনুশীলন আনন্দ দেয়, যদিও সেক্ষেত্রে আছে কিছু আতিশয্য, কিছু হয়তো অনভিপ্রেত উন্নাসিকতা; কিছু অভিমানসঞ্জাত রূঢ়তা।”

বইমেলাতে তারা যেন ব্রাত্য– ইংরেজি (কিংবা চটকদারবাংলা) বই আর ইলিশমাছ ভাজার আনন্দে যাঁরা ভিড় করেন তাঁরা এই ব্রাত্যদের তেমন তোয়াক্কা করেন না। বাংলাদেশেও বহু এবম্বিধ পত্রিকা প্রকাশ হয় শুনেছি। আর এইজন্যই উভয় দেশ মিলে এই লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনকে বিকশিত করার কাজে আকাদেমির আনুকূল্য কাম্য মনে করি। যদি এ-বিষয়ে আমার প্রত্যাশা আপনাদের সমর্থন পায় তো খুশি হব।” (হীরেন্দ্রনাথ লিটল ম্যাগাজিন শব্দ দুটি রোমান হরফে লিখেছিলেন। )

তারপরে গঙ্গা দিয়ে, এবং পদ্মা দিয়েও, অনেক জল ও ক্যাথিড্রাল চার্চে অনেকগুলি বড়ো দিন চলে হিয়েছে। ওঁদের মতো মানুষদের কথায় ও অবশ্যই নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকেও, আকাদেমি কর্তৃপক্ষ শুধু লিটল ম্যাগাজিন নিয়েই একটা মেলার আয়োজন করে আসছেন। প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের ১১ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত আয়োজিত হয় এই বাৎসরিক সাহিত্য উৎসব। দিন কোনও কোনও বছর একটু এদিক-ওদিক হয়। ২০১৭-এ মোহরকুঞ্জে ভাগ করে, পরবর্তীতে সল্টলেকে রবীন্দ্র-ওকাকুরায় তিন বছর প্রবাসে থেকে এবং অতিমারির বিশৃঙ্খলা কাটিয়ে উঠে সেই মেলা আবার স্বমহিমায় স্বস্থানে আয়োজিত হচ্ছে। আমরা আনন্দিত।


এখন কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপ বনগাঁ থেকে বাঁকুড়া-বর্ধমান-পুরুলিয়া সারা বাংলা জুড়েই লিটল ম্যাগাজিন মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। শীত এলেই নতুন করে জেগে ওঠে বাংলা বর্ণমালা। তরুণ প্রজন্ম ধারাবাহিক ভাবে ব্যাটন হাতে তুলে নিচ্ছে। মেলার মানচিত্রে বজবজ বোলপুর তারকেশ্বর জলপাইগুড়ি— এইসব স্থানের নাম জুড়ে যাচ্ছে বছর বছর। ফলে যেমন জন্ম হচ্ছে অনেক নতুন মেলার, তেমনই পুরুলিয়া, বর্ধমান বা কৃষ্ণনগরের মতো অনেক মেলা যথেষ্ট গৌরব অর্জন করেছে, গড়ে তুলেছে আত্মপরিচয়। তবে এই সবগুলোই ব্যক্তিগত উদ্যোগ।

বিভিন্ন সূত্রে জানতে পারি এই মেলাগুলোয় লিটল ম্যাগাজিন ও তাঁদের প্রকাশিত বইপত্রের বিক্রিও নাকি মোটের ওপর ভালো। অর্থাৎ, পাঠক জাগছে! কিছু সমালোচনা নিশ্চয়ই সম্ভব; কিন্তু সে তো অন্দরমহলের ব্যাপার। কলকাতা বইমেলাতেও লিটল ম্যাগাজিনের জন্য একটা এলাকা নির্দিষ্ট করা থাকছে। এই সমস্তই সম্ভব হয়েছে হীরেন্দ্রনাথদের মতো মানুষদের জন্য। প্রবাদপ্রতিম প্রয়াত সন্দীপ দত্তের ও তাঁর লাইব্রেরির অবদানও স্বীকার্য।
কিন্তু আকাদেমি আয়োজিত মেলাটি কিঞিৎ গুরুত্বপূর্ণ। মূল কারণ দুটি। এক, এটি সরকারি মেলা বলে অংশগ্রহণকারীদের যাতায়াত বা থাকার ব্যবস্থা ছাড়া আর কোনো খরচ নেই। মেলাটি সরকারি, অর্থাৎ এর আয়োজনের পয়সা আমরাই যোগাচ্ছি।

দূরের পত্রিকাগুলিকে যাতায়াতের রাহাখরচ ও থাকার কিছু ব্যবস্থা, অর্থের বিনিময়েই, করা যায় কিনা আকাদেমি ভেবে দেখতে পারে। দ্বিতীয় কারণ হল, স্থানজনিত। সবার পক্ষে সারা বাংলা থেকে বা বাংলার বাইরে থেকেও প্রকাশিত সব পত্রিকার সব খবর রাখা বা পাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া মেলা মানে তো মিলনও। সম্পাদকদের সঙ্গে লেখকের, লেখকের সঙ্গে পাঠকের এবং সর্বোপরি বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুদের দেখা-আড্ডার জায়গা এই মেলা। তিন বছর (২০১৮-২০২০) কলকাতায় একটা লিটল ম্যাগাজিন মেলার আয়োজনে জড়িত ছিলাম বলে অভিজ্ঞতা থেকে জানি, কলকাতায় একটা কেন্দ্রীয় মেলার গুরুত্ব ঠিক কেন ও কোথায়। সেইদিক থেকেও আকাদেমির এই মেলার মূল্য।
যতদূর জানি, ব্যক্তিগত উদ্যোগের মেলাগুলোতেও পত্রিকাদের কাছ থেকে কোনও টাকা নেওয়া হয় না, বা নিলেও সামান্য। সেক্ষেত্রে স্পনসরদের ওপর নির্ভর করতে হয়, নির্ভর করতে হয় সরকারি সাহায্যের জন্য। তার একটা অনিবার্য কুফল আছে। মঞ্চে সম্পাদক কবি লেখকদের সঙ্গে একাসনে স্থান দিতে হয় প্রশাসনিক আধিকারিকদের, লোকাল কাউন্সিলর, সাহিত্য বা লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে সম্পর্কহীন মানুষদের। স্বাধীনচিত্ততার সঙ্গে কোনও আপোষ কি করতে হয়? পথ বা উপায় কী? সমাজ-গবেষকরা নিশ্চয়ই আলো খুঁজছেন।

লিটল ম্যাগাজিন বলতেই যাঁর কথা অনিবার্য মনে আসে সেই সন্দীপ দত্তের স্মৃতিতে প্রথম ভাষণে একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে অধ্যাপক সুকান্ত চৌধুরী ওঁর লাইব্রেরি নিয়ে বলেছিলেন ‘সংরূপ হিসেবে লিটল ম্যাগাজিনের অস্তিত্ব এবং স্বকীয়’ গুরুত্বের কথা। শ্রী চৌধুরীর ‘স্মৃতি, লিপি, নথি’ শিরোনামের এই মুদ্রিত বক্তৃতাটি অবশ্যপাঠ্য আমাদের সবার।
আমার একটা অনুভবের কথা প্রসঙ্গত ভাগ করে নিতে চাই। গত মোটামুটি ২৫ বছরে লিটল ম্যাগাজিনে একটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছু কিছু পত্রিকা বিশেষ বিষয়ে সংখ্যা করছে। সেগুলি ওজনে ও দামে বেশ ভারি।

সংখ্যাগুলিও গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহ নেই। কিন্তু কোথাও কি বাণিজ্য বা বাজার প্রভাব ফেলছে? বাণিজ্য ভালো কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু শুধুই বাণিজ্য লক্ষ্য হলে লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে কি চরিত্রহানি
হয় না?
লন্ডনের পুরনো পত্রিকার বিপণিতে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ১৯২০ সালে প্রকাশিত এক পত্রিকায় কীথ প্রেস্টন নামে এক কবির লেখা চারটে পংক্তি পেয়েছিলেন : At all the literary scenes/ Saddest this sight to me/ The graves of little magazines/ who died to make verse tree… সত্যিই, কত পত্রিকা যে মরে গেল গাছটাকে বাঁচিয়ে রাখতে!আমি যতদূর জানি ১৯৫৩ সালের মে মাসে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি লেখায় বুদ্ধদেব বসু বাংলায় লিটল ম্যাগাজিন শব্দবন্ধ প্রথম ব্যবহার করেছিলেন। সেই লেখায় তিনি বলছেন, “লিটল ম্যাগাজিন নামেই যখন প্রতিবাদ, তখন অন্তরেও নিশ্চয়ই তা থাকা চাই – আর সেটা শুধু একজন অধিনায়কেরও নয়, একটা সাহিত্য গোষ্ঠীর।”

পণ্ডিত ও গবেষকরা অনেক তর্কবিতর্কের পরে প্রায় সহমত হয়েছেন যে ১৯১৪ সালে প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘সবুজ পত্র’ ( অনেকেই ভুল করে মধ্যের ফাঁকটুকু তুলে ‘সবুজপত্র’ লেখেন) হল প্রথম বাংলা লিটল ম্যাগাজিন। ‘বঙ্গদর্শন’-এর সঙ্গে এই বিষয়ে ‘সবুজ পত্র’-এর একটা দড়ি টানাটানি আছে। তা সে পন্ডিতরা তর্কে মাতুন, আমি এ বিষয়ে অধিকারী নই, যোগ্যতাও নেই। আমার বলার কথা এই যে সেই ‘সবুজ পত্র’-এর প্রথম সংখ্যার জন্য রবীন্দ্রনাথ একটা নতুন কবিতা লেখেন, নাম ‘সবুজের অভিযান’। ‘আধমরাদের ঘা মেরে’ বাঁচানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।ভারতের সর্বত্র এখন ঘা-মারতে পারে এমন প্রতিবাদীদের ভীষণ প্রয়োজন।
(ঋণ: লিটল ম্যাগাজিনঃ স্বরূপ সংকট সম্ভাবনা, সম্পাদনা- বরেন্দু মণ্ডল। কীথ প্রেস্টনের তথ্য বিশ্বজিৎ পাণ্ডার লেখা থেকে প্রাপ্ত৷)