আপনার বহুদিনের ভরসার টুথপেস্টই ডেকে আনতে পারে আচমকা হার্টের বিপদ? সাবধান

টুথেপস্ট ব্যবহার করুন, জেনে...

আপনার পছন্দের একটা নীল বা লাল বা সাদা টুথপেস্টের টিউব। রোজ সকালে বা খাবার খাওয়ার পর সেটিই আপনার সঙ্গী। দাঁত সেনসিটিভ, তাই সেনসোডাইন (Sensodyne) বা এই ধরনের যে কোনও সেনসিটিভিটি টুথপেস্ট (Sensitivity Toothpaste) বহু বছর ধরেই আপনি নিয়মিত ব্যবহার করে যাচ্ছেন। দিনে দু’বার মাজলেই ঠান্ডা-গরমের কষ্ট কমে। বিজ্ঞাপনেও তো দেখা যায়, এই মাজনের গুণেই হাসিমুখে আইসক্রিম খাচ্ছেন অভিনেত্রী। কথায় বলে, লুকস আর ডিসেপটিভ। সেই একই কথা প্রযোজ্য এই নিরীহ, ঘরোয়া টুথপেস্টের ক্ষেত্রেও।

এই টুথপেস্টের ভেতরে কী আছে, সেটা কি কখনও প্যাকেটের পেছনে দেখেছেন?

ছোট ছোট অক্ষরে সেখানে লেখা থাকে: পটাশিয়াম নাইট্রেট (Potassium Nitrate) ৫%। আপাতদৃষ্টিতে নেহাতই একটা মামুলি উপাদান মনে হলেও, এই রাসায়নিক যৌগটি কিন্তু হেলাফেলার নয়। এই সল্টটি হৃদরোগী বা কিডনির রোগীর কাছে একটু আলাদা গুরুত্ব বহন করে।


কী করে এই উপাদান?

সেনসিটিভিটির টুথপেস্টের মূল কাজ দাঁতের ভেতরের স্নায়ুকে শান্ত রাখা। পটাশিয়াম নাইট্রেট ঠিক সেই কাজটাই করে। দাঁতের ডেন্টিন (Dentin) স্তরে থাকা ক্ষুদ্র নলগুলোর মধ্যে দিয়ে এই যৌগ স্নায়ুর কাছে পৌঁছয় এবং ব্যথার সংকেত পাঠানো বন্ধ করে দেয়।

বিজ্ঞানের ভাষায় এটাকে বলা হয়, নার্ভ ডিপোলারাইজেশন (Nerve Depolarization)। সহজ ভাষায়, স্নায়ুকে কিছুটা অসাড় করে রাখা।

সাধারণ মানুষের জন্য এই প্রক্রিয়া নিরাপদ। কিন্তু হার্ট বা কিডনির রোগীদের গল্পটা একটু আলাদা।

হার্টের রোগীর বিপদ কোথায়?

হৃদরোগীদের রক্তে সাধারণত পটাশিয়ামের মাত্রা এমনিতেই বেশি থাকে। চিকিৎসার ভাষায় এই অবস্থার নাম হাইপারক্যালেমিয়া (Hyperkalemia)। হার্ট ফেলিওর (Heart Failure) রোগীদের মধ্যে এই সমস্যা বাস্তবে ২৫ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে দেখা যায়।

রক্তে পটাশিয়াম বেড়ে গেলে হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক ছন্দ বিগড়ে যেতে পারে। তৈরি হতে পারে অ্যারিদমিয়া (Arrhythmia), যা কিছু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতীও হতে পারে। হৃদরোগীরা অনেকেই এমন ওষুধ খান যেগুলো শরীরে পটাশিয়াম ধরে রাখে। সেই ওষুধের উপর যদি টুথপেস্টের পটাশিয়াম নাইট্রেট থেকে শোষিত অতিরিক্ত পটাশিয়াম এসে যোগ দেয়, তাহলে ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

কিডনির রোগীরা কেন সতর্ক থাকবেন?

সুস্থ কিডনি শরীর থেকে অতিরিক্ত পটাশিয়াম বের করে দেয়। কিন্তু কিডনির রোগে সেই ক্ষমতা কমে আসে। দীর্ঘদিনের ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (Chronic Kidney Disease) রোগীদের মধ্যে হাইপারক্যালেমিয়া সবচেয়ে পরিচিত বিপদ।

এই রোগীরা যদি প্রতিদিন সেনসিটিভিটির টুথপেস্ট ব্যবহার করেন এবং কিছুটা গিলে ফেলেন বা মুখের মাধ্যমে শোষিত হয়, তাহলে সেই পটাশিয়ামের বোঝা কিডনি বহন করতে পারে না। ফলে সংকট আরও গভীর হয়।

তাহলে কি এই টুথপেস্ট একেবারে বিপজ্জনক?

না, এতটা নয়।

বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, টুথপেস্টে পটাশিয়াম নাইট্রেটের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। মুখ থেকে শোষিত হওয়ার পরিমাণও অত্যন্ত কম। সুস্থ মানুষের কাছে এটা সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং কার্যকর।

কিন্তু সমস্যা হলো, হৃদরোগী বা কিডনির রোগীরা অনেক সময় অজান্তেই টুথপেস্ট গিলে ফেলেন বা মুখে দীর্ঘক্ষণ রেখে দেন। বয়স্ক রোগীদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। সেই অল্প পরিমাণ পটাশিয়ামও তাঁদের জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিকল্প কী?

সেনসিটিভিটির টুথপেস্টেই আপনাকে দাঁত মাজতে হবে এমন তো কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। স্ট্যানাস ফ্লুরাইড (Stannous Fluoride) বা হাইড্রোক্সিঅ্যাপাটাইট (Hydroxyapatite) ভিত্তিক টুথপেস্টও দাঁতের সেনসিটিভিটি কমাতে পারে। এগুলো পটাশিয়াম নাইট্রেটের মতো পদ্ধতিতে নয়, বরং দাঁতের খোলা নলগুলো বন্ধ করে সংবেদনশীলতা কমানোর কাজ করে।

হার্ট বা কিডনির রোগীরা অবশ্যই নিজেদের দাঁতের ডাক্তার ও হৃদরোগ বা নেফ্রোলজি বিশেষজ্ঞকে জানান কোন টুথপেস্ট ব্যবহার করছেন। চিকিৎসক-ই প্রয়োজনে বিকল্প পরামর্শ দেবেন।

যে কথাটা কেউ বলে না

আমরা প্রতিদিন কত কিছু মুখে দিই, কিন্তু তাতে রয়েছেটা কী—সেই উপাদান পড়ি না। তাই সেই নিয়মেই সকালের রুটিনের অংশ হয়ে যাওয়া টুথপেস্টটা কখনওই প্রশ্নের মুখে পড়ে না।

কিন্তু চিকিৎসকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দীর্ঘস্থায়ী রোগ থাকলে ওষুধ, খাবার, এমনকি রোজকার টুথপেস্টটাকেও একবার প্রশ্ন করে নেওয়া দরকার।

বাথরুমের রাখা আপনার পছন্দের সেই নীল, লাল বা সাদা টিউবটার পেছনের ছোট হরফের লেখাটা আজই একবার পড়ুন। বিশেষত যদি আপনার হার্ট বা কিডনির সমস্যা থাকে। কে বলতে পারে, এই একটা অভ্যাসই বাঁচিয়ে দিতে পারে আপনার জীবন।

 

দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি সচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত। নিজের ওষুধ বা দৈনন্দিন অভ্যাস পরিবর্তনের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।