Explained: ট্রাম্পের নিশানায় ইরানের রহস্যময় ‘পিকঅ্যাক্স পাহাড়’, কেন এই হুমকি এত ভাবাচ্ছে?

ট্রাম্পের নজরে পিকঅ্যাক্স পাহাড় (AI নির্মাণ)

যুদ্ধের আঁচ রোজ বাড়ছে পশ্চিম এশিয়ায়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ বার সরাসরি নিশানা করলেন ইরানের এক রহস্যময়, অতি সুরক্ষিত পাহাড়ি স্থাপনাকে, যার নাম পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন [Pickaxe Mountain]। জনপ্রিয় রক্ষণীল রেডিও হোস্ট হিউ হিউইটের অনুষ্ঠানে স্পষ্ট ভাষায় ট্রাম্প জানিয়ে দেন, আমেরিকা এ বার পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে গুঁড়িয়ে দিতে চলেছে। ইরানকে চরম আঘাতে জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে। তাঁর কথায়, ইরানের তরফে নজরদারিতে এখনও তেমন কোনও তৎপরতা তাঁরা দেখতে পাননি ওই পাহাড়ে। শীঘ্রই সেখানে বড়সড় আঘাত হানা হতে পারে। প্রশ্ন হল, ঠিক কী এই পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন? আর ট্রাম্প এই পাহাড়টিকে এত গুরুত্বই বা দিচ্ছেন কেন? কোন রহস্য লুকিয়ে পিরঅ্যাক্সে, যা নিয়ে এত মাথাব্যথা ওয়াশিংটনের? এই হুমকির প্রভাব ভারতের অর্থনীতিতে কতটা পড়তে পারে?

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন আসলে কী

তেহরানের দক্ষিণে জাগ্রোস পর্বতমালার কোলে, ইসপাহান প্রদেশে অবস্থিত এই পিকঅ্যাক্স। ইরানে এটি পরিচিত কুহ-এ কোলাং গাজ লা নামে। ইরানের বহুচর্চিত নাতানজ ইউরেনিয়াম কেন্দ্র থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই পাহাড়ের গভীরে রয়েছে জোড়া সুড়ঙ্গপথের জাল, যা প্রায় ২০০০ ফুট পুরু গ্রানাইট পাথরের নীচে সুরক্ষিত। ২০২০ সালের শেষ দিকে এই স্থাপনার নির্মাণকাজ শুরু হয়, সে সময়ে ইরান সরকার একে সেন্ট্রিফিউজ সংযোজন কারখানা বলে দাবি করেছিল। কিন্তু নির্মাণের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শক সংস্থা [International Atomic Energy Agency, IAEA]-কে সেখানে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি, যার জেরে পশ্চিমি গোয়েন্দা মহলে সন্দেহ ক্রমশ ঘনীভূত হয়েছে যে এখানে গোপনে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ চলছে।


কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

লক্ষণীয় বিষয় হল, ২০২৫ সালের জুনে আমেরিকা ও ইজরায়েলের যৌথ হামলায় (যাকে বলা হয়, অপারেশন মিডনাইট হ্যামার) নাতানজ, ফোর্দো এবং ইসপাহানের পরমাণু কেন্দ্রগুলিতে আঘাত হানা হলেও, পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন সে সময়ে অক্ষত থেকে যায়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া অপারেশন এপিক ফিউরিতেও এই স্থাপনায় হাত দেওয়া হয়নি এখনও পর্যন্ত। ফলে ইরানের পরমাণু কর্মসূচির শেষ অক্ষত ঘাঁটি হিসেবে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনকে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।

হুমকির নেপথ্যে

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা শুরু করে, যার প্রথম ধাক্কাতেই নিহত হন ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই-সহ একাধিক শীর্ষ সামরিক কর্তা। তাঁর ছেলে মোজতাবা খামেনেই নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রত্যাঘাতে ইরান আমেরিকা ও ইজরায়েলের ঘাঁটি লক্ষ্য করে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, পাশাপাশি বন্ধ করে দেয় বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালী [Strait of Hormuz]। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এপ্রিলে একটি সংঘর্ষবিরতি চুক্তি হলেও তা বারবার ভেঙে পড়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসে ফের উত্তেজনা তুঙ্গে, গত সপ্তাহেই হরমুজ প্রণালীতে দু’টি তেলবাহী জাহাজে ইরানি হামলায় প্রাণ হারান এক ভারতীয় নাবিক, আহত হন আরও কয়েকজন ভারতীয় ও ইউক্রেনীয় কর্মী। ঠিক এই আবহেই ট্রাম্পের মুখে উঠে আসে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনের নাম।

বোমা ফেলেই কি ধ্বংস করা সম্ভব

প্রশ্ন উঠছে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়েও। আমেরিকার হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী বাংকার বাস্টার বোমা [GBU-57/B Massive Ordnance Penetrator, MOP], যার ওজন প্রায় ত্রিশ হাজার পাউন্ড, তৈরিই হয়েছিল মূলত ইরানের ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলি ধ্বংসের কথা মাথায় রেখে। ২০২৫ সালে ফোর্দোর মতো অপেক্ষাকৃত কম গভীর স্থাপনা ধ্বংস করতেই ১২টি MOP ব্যবহার করতে হয়েছিল আমেরিকাকে, একই স্পটে পরপর ফেলে ধীরে ধীরে গভীরে পৌঁছনো হয়েছিল। পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন তার চেয়েও অনেক বেশি গভীরে প্রোথিত হওয়ায়, বিশেষজ্ঞদের একাংশের স্পষ্ট বক্তব্য, প্রচলিত অস্ত্রে এই পাহাড়ের মূল সুড়ঙ্গ পর্যন্ত পৌঁছনো কার্যত অসম্ভব। আমেরিকার হাতে থাকা পরমাণু বোমার [B61-11] মতো অস্ত্র প্রযুক্তিগতভাবে এই কাজ করতে সক্ষম হলেও, তেমন কোনও পদক্ষেপের ইঙ্গিত এখনও পর্যন্ত মেলেনি। আর এটা যদি হয়, তবে তা হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার এক বিশ্বজোড়া সংকট।

ইরানের প্রতিক্রিয়া

ট্রাম্পের এই হুমকিকে ইরানের সংসদের স্পিকারের উপদেষ্টা মেহদি মহম্মদি কটাক্ষ করে বলেছেন, আমেরিকা নিজেই সামরিক বিকল্প ফুরিয়ে ফেলেছে বলেই এমন এক লক্ষ্যবস্তুর কথা ভাবছে। এই টার্গেটকে খোদ মার্কিন সেনার নথিতেই ধ্বংস করা অসম্ভব বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর দাবি, পশ্চিম এশিয়া-সহ গোটা বিশ্বকে অগ্নিগর্ভ করে তোলার ঝুঁকি নিয়েই এমন হামলার কথা ভাবছেন ট্রাম্প।

ভারতের উপর প্রভাব

এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় আঁচ পড়ছে জ্বালানি বাজারে। হরমুজ প্রণালী দিয়েই বিশ্বের প্রায় এক পঞ্চমাংশ অশোধিত তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস [Liquefied Natural Gas, LNG] পরিবহন হয়। সাম্প্রতিক হামলার জেরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮৩ ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। ভারত তার মোট অশোধিত তেলের প্রয়োজনের ৮৫ শতাংশের বেশি আমদানি করে। যদিও রাশিয়া, আমেরিকা ও আফ্রিকার মতো বিকল্প উৎস থেকে আমদানি বাড়িয়ে হরমুজ নির্ভরতা কিছুটা কমানো হয়েছে। তবে রান্নার গ্যাস বা [Liquefied Petroleum Gas, LPG]-র ক্ষেত্রে ছবিটা এখনও উদ্বেগজনক, কারণ ভারতের মোট এলপিজি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসে এই জলপথ দিয়ে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়বে পরিবহণ খরচ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে, যার আঁচ এড়াতে পারবে না পশ্চিমবঙ্গও। উপসাগরীয় দেশগুলিতে কর্মরত বহু বাঙালি প্রবাসী শ্রমিকের জীবিকা এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বা অর্থের উপরেও এই অস্থিরতার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞেরা। পাশাপাশি ভারতীয় মালবাহী জাহাজের নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে ক্রমশ।

এর পর কী

কূটনীতির দরজা যদিও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। ট্রাম্প নিজেই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামিয়ে সমঝোতায় পৌঁছনো এখনও সম্ভব বলেই মনে করেন তিনি। একইসঙ্গে তিনি চান, আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শক সংস্থা যেন পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে গিয়ে সরেজমিনে খতিয়ে দেখে সেখানে আসলে কী চলছে। তবে বাস্তবে যদি ট্রাম্প হামলা করেন, তবে ভয়াবহ সংকট দেখা দেবে বলেই আশঙ্কা কূটনৈতিক মহলের।