মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হতেই ফের তেহরানে দেখা গেল রাশিয়ার সেই বিশেষ বিমান, ডুমসডে প্লেন (Doomsday Plane)। সোমবার মস্কোর ভনুকোভো বিমানবন্দর থেকে উড়ে তেহরানের ইমাম খোমেইনি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে রাশিয়ার তুপোলেভ তু-২১৪পিইউ (Tupolev Tu-214PU)। ফ্লাইটরাডার২৪ (Flightradar24)-এর তথ্য অনুযায়ী এই সফরের খবর সামনে আসতেই কূটনৈতিক মহলে জল্পনা তুঙ্গে।
বিমানটি ঠিক কী ধরনের
তু-২১৪পিইউ আদতে একটি যাত্রিবাহী তু-২১৪ বিমানের বিশেষ সংস্করণ, যা মূলত ক্রেমলিনের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের জন্য উড়ন্ত কমান্ড পোস্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রাশিয়ার অভিজাত রসিয়া স্পেশাল ফ্লাইট স্কোয়াড্রন (Rossiya Special Flight Squadron) পরিচালিত এই বিমানে থাকে সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, এনক্রিপ্টেড ডেটা লিঙ্ক এবং সংকটকালীন পরিস্থিতিতে সরকারি ও সামরিক অভিযান সমন্বয় করার প্রযুক্তি। ৭০০০ কিলোমিটারেরও বেশি উড়ানের ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিমানকে সাধারণ ভিভিআইপি উড়ানের চেয়ে আলাদা করে তোলে এর উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও কার্যকর থাকার ক্ষমতা।
কেন ঠিক এখনই ইরানে
তেহরানে এই বিমানের উপস্থিতিকে নিছক কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না পর্যবেক্ষকরা। মস্কো ও তেহরানের মধ্যে শীর্ষ পর্যায়ের সমন্বয়ের ইঙ্গিত হিসেবেই এটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে, বিশেষত যখন আমেরিকা ও ইরান একে অপরের বিরুদ্ধে ভারী মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, শনিবার রাতে তারা ইরানের ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে, যার ফলে গত তিন রাতে মোট আক্রমণের সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। পাল্টা জবাবে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) কুয়েত, জর্ডন, ওমান ও কাতারে মার্কিন সামরিক পরিকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করেছে।<blockquote class=”twitter-tweet”><p lang=”en” dir=”ltr”>🇷🇺🇮🇷⚡️ Several aircraft from Russia’s Special Flight Squadron just left Moscow. One appears to be preparing to land in Tehran, while the Russian “Doomsday” plane has also taken off and is heading toward Iran.<br><br>This raises questions about whether they’re delivering supplies,… <a href=”https://t.co/W13HLIPMJn”>pic.twitter.com/W13HLIPMJn</a></p>— War Flash (@WarFlash_2630) <a href=”https://x.com/WarFlash_2630/status/2076534493532549154?ref_src=twsrc%5Etfw”>July 13, 2026</a></blockquote> <script async src=”https://platform.x.com/widgets.js” charset=”utf-8″></script>
কীভাবে ফিরল যুদ্ধ
এই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের উপর সামরিক অভিযান শুরু করে, যাকে ওয়াশিংটন নাম দিয়েছিল অপারেশন এপিক ফিউরি (Operation Epic Fury)। সেই হামলাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে দায়িত্ব নেন পুত্র মোজতাবা খামেনেই। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ইরাকের নাজাফে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত ১৭ জুন ৬০ দিনের একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি সই হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালীতে (Strait of Hormuz) স্বাভাবিক জাহাজ চলাচল ফেরানো, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু জুলাইয়ের শুরু থেকেই ওই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে, ফের শুরু হয়েছে হামলা-পাল্টা হামলার পালা।
রাশিয়া-ইরান সম্পর্কের সূত্র
এই প্রথম নয়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও একবার তু-২১৪পিইউ তেহরানে গিয়েছিল, তখনও পরিস্থিতি ছিল সমান উত্তপ্ত। রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ পাঁচশো কোটি ডলার (Five Billion Dollar) ছাড়িয়ে গিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে, যার মধ্যে রয়েছে সামরিক-প্রযুক্তিগত সহযোগিতা থেকে শুরু করে জ্বালানি সংক্রান্ত আদানপ্রদানও। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার মুখে মস্কো ও তেহরান পরস্পরের উপর ক্রমশ বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে, যদিও দুই দেশের মধ্যে এখনও কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই।
মধ্যস্থতার চেষ্টা
সংঘাত থামাতে সক্রিয় হয়েছে পাকিস্তানও। দেশটির উপ-প্রধানমন্ত্রী ইশাক দার ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে সংযম দেখানোর আর্জি জানিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে হওয়া পূর্বতন সমঝোতা কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছে, এবং প্রয়োজনে হামলা আরও তীব্র করা হবে।
ভারতের জন্য উদ্বেগের
এই সংঘাতের আঁচ থেকে বাদ যাচ্ছে না ভারতও। বিশ্বের মোট অশোধিত তেল বাণিজ্যের প্রায় এক পঞ্চমাংশ এবং রান্নার গ্যাসের (LPG) সিংহভাগ সরবরাহ যায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে, আর ভারত প্রায় ৯০ শতাংশ এলপিজি আমদানি করে এই পথেই। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল-পিছু ৭৮ ডলার ছাড়িয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, দেশীয় জ্বালানির দাম আপাতত অপরিবর্তিত রয়েছে এবং অশোধিত তেল আমদানির উৎস আগের চেয়ে অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। তা সত্ত্বেও ফেব্রুয়ারি থেকে এখনও পর্যন্ত দু’-দু’বার ঘরোয়া রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে।
কলকাতার সঙ্গে এই সংকটের সরাসরি যোগও রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকে আরব সাগরের উপর দিয়ে যাওয়া একাধিক আন্তর্জাতিক উড়ান বাতিল হওয়ায় দোহাগামী একটি কাতার এয়ারওয়েজের বিমানকে কলকাতায় নামতে বাধ্য হতে হয়েছিল। কলকাতা থেকে আমেরিকাগামী যাত্রীদের প্রায় 70 শতাংশ উপসাগরীয় দেশের বিমানবন্দর হয়ে যাতায়াত করেন বলে ভ্রমণ সংস্থাগুলির হিসেব, ফলে উপসাগরীয় আকাশপথে অস্থিরতা সরাসরি প্রভাব ফেলছে বাংলার আন্তর্জাতিক যাত্রীদের উপরেও। এছাড়া উপসাগরীয় দেশে কর্মরত বহু ভারতীয়, যার একাংশ পশ্চিমবঙ্গেরও, তাঁদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জুন মাসে ওমান উপকূলে মার্কিন হামলায় একটি তেল ট্যাঙ্কারে তিনজন ভারতীয় নাবিকের মৃত্যু হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। বিদেশ মন্ত্রক ইতিমধ্যেই পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু করেছে।