বিশ্বের চোখে ভারতের ছবিটা একরকম নয়। কোথাও উচ্ছ্বাস, কোথাও তীব্র বিরাগ। মার্কিন সমীক্ষা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের (Pew Research Center) সাম্প্রতিক গ্লোবাল অ্যাটিটিউডস সার্ভেতে (Global Attitudes Survey) সেই ছবিই স্পষ্ট হয়ে উঠল। ৩৬টি দেশের ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষের মতামত নিয়ে তৈরি এই সমীক্ষা চলেছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত। প্রতিবেশী দেশগুলির মধ্যে ভারতের রেটিং যাকে বলে একেবারে দুই মেরুতে অবস্থান করছে। শ্রীলঙ্কায় যেখানে ৭৯ শতাংশ মানুষ ভারতকে ভালো চোখে দেখেন, পাকিস্তানে সেই সংখ্যা মাত্র ৭ শতাংশ। মোটের উপর ৩৬টি দেশের মধ্যে গড়ে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, আর ৪১ শতাংশের মনোভাব নেতিবাচক।
বাংলাদেশে ছবিটা কালো
পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা হল, পড়শি বাংলাদেশ (Bangladesh) এখন ভারতকে কেমন চোখে দেখছে। উত্তরটা স্বস্তিদায়ক নয়। বাংলাদেশে এখন মাত্র ৪২ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, আর ৫১ শতাংশের মনোভাব নেতিবাচক। ২০২৪ সালে এই ইতিবাচকতা অনেকটাই বেশি ছিল। তখন সংখ্যাটা ছিল ৫৭ শতাংশ, অর্থাৎ মাত্র দু’ বছরে ভারতের ভাবমূর্তির ক্ষয় হয়েছে ১৫ পয়েন্ট। এই ধসের নেপথ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ও রাজনৈতিক অভ্যুত্থানের (political upheaval) পর দুই দেশের সম্পর্কে জমে ওঠা টানাপোড়েন। শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর থেকেই নয়াদিল্লি ও ঢাকার সম্পর্কে চিড় ধরেছে। সীমান্তের ওপার-এপার দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক যোগসূত্র যতটা গভীর, রাজনৈতিক দূরত্বও এখন ততটাই প্রকট।
পাকিস্তানে তীব্র ভারত-বিরোধিতা
দুই পড়শি দেশের পারস্পরিক বৈরিতার ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়েছে পিউয়ের একটি পৃথক প্রতিবেদনে। ভারতের ৫৪ শতাংশ মানুষ পাকিস্তানকে সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক (geopolitical) হুমকি বলে মনে করেন, তার পরেই রয়েছে চিন। ২১ শতাংশের ভারতীয় নাগরিকের মতে, চিন পরম শত্রু। উল্টো দিকে, পাকিস্তানেরও ৪৩ শতাংশ মানুষ ভারতকেই তাঁদের সবচেয়ে বড় হুমকি বলে মনে করেন। স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পরেও দুই দেশের মধ্যে সেই বহমান অবিশ্বাস এখনও এতটুকু কমেনি।
আমেরিকা-সহ পশ্চিমি দুনিয়া
আমেরিকায় (America) ছবিটা ভালো-খারাপের মাঝামাঝি। সেখানে ৪৫ শতাংশ মানুষ ভারতকে ভালো চোখে দেখেন, ৫০ শতাংশের মনোভাব নেতিবাচক। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের তুলনায় ভারতের প্রতি বেশি সহানুভূতিশীল। তবে ইউরোপে ছবিটা একেবারে উল্টো। ২০২৫ সালের পর থেকে ব্রিটেনে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ১১ পয়েন্ট এবং জার্মানিতে ৬ পয়েন্ট বেড়েছে। ২০২৩ সালের প্রেক্ষিতে তুলনা করলে জার্মানিতে ইতিবাচক রেটিং ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬৩ শতাংশ, আর ফ্রান্সে ৩৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশ হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় (South Korea) অবশ্য উল্টো স্রোত, ২০২৩ সালের ৫৯ শতাংশ থেকে কমে এখন তা দাঁড়িয়েছে ৪৪ শতাংশে।
প্রতিবেশী শ্রীলঙ্কা উজ্জ্বল
দক্ষিণ এশিয়ার (South Asia) দেশুগলির মধ্যে শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka) এই সমীক্ষায় সবচেয়ে বড় চমক। ২০২৪ সালে সেখানে ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব ছিল ৬৫ শতাংশ, এখন তা বেড়ে ৭৯ শতাংশ হয়েছে, অর্থাৎ ১৪ পয়েন্টের লাফ। এশিয়ার (Asia) অন্যান্য দেশগুলিতেও ভারতের ছবি মোটের উপর ভাল। জাপানের ৫৫ শতাংশ, সিঙ্গাপুরের ৫১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ৫০ শতাংশ এবং ফিলিপিন্সের ৪৯ শতাংশ মানুষ ভারতকে ভালো নজরেই দেখেন। মালয়েশিয়া অবশ্য এখানে ব্যতিক্রম, সেখানে ৫৮ শতাংশ মানুষের মনোভাব প্রতিকূল। অন্য দিকে তুরস্ক ও পশ্চিম এশিয়ার (West Asia) কিছু অঞ্চলে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা সবচেয়ে কম, তুরস্কে মাত্র ১৫ শতাংশ এবং ওয়েস্ট ব্যাংক ও পূর্ব জেরুজালেমে মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
বার্তাটা কী
পশ্চিমবঙ্গের মতো সীমান্তবর্তী রাজ্যের কাছে এই সমীক্ষার তাৎপর্য একটু আলাদা। বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, দুই বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগ, আর সীমান্ত-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীলতা, সব মিলিয়ে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের উত্থান-পতন সরাসরি প্রভাব ফেলে এই রাজ্যের অর্থনীতি ও সামাজিক পরিস্থিতিতে। পিউয়ের হিসেব বলছে, বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব যত বাড়বে, তার সরাসরি প্রভাব পড়বে সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গেই।