Explained: এক দেশ, এক সময়: মোদী সরকারের বড় সিদ্ধান্তে সব্বাইকে পাল্টাতে হবে ঘড়ি, ঠিক কী ঘটছে জানুন

One Nation, One Time (Magnific)

সময় নিয়ে দেশজুড়ে বড়সড় সংস্কারের পথে হাঁটল মোদী সরকার। কেন্দ্রের ভোগ্যপণ্য মন্ত্রকের অধীন ভোক্তা বিষয়ক দপ্তর গত ২৭ আগস্ট বিধিবদ্ধ ভাবে জারি করেছে লিগাল মেট্রোলজি (ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম) রুলস, ২০২৬। এই নিয়মের ফলে দেশের সমস্ত আইনি, প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও সরকারি কাজকর্মে ভারতীয় প্রমাণ সময় বা আইএসটি (IST)-ই হয়ে উঠবে একমাত্র বৈধ সময়ের মাপকাঠি। কেন্দ্রের এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে এক দেশ, এক সময় (One Nation, One Time)।

আপনার হাতঘড়ি বা মোবাইল ফোনের সময়ে অবশ্য কোনও পরিবর্তন আসছে না। বদলাচ্ছে না দেশের সময় অঞ্চলও (Time Zone)। আসল বদলটা ঘটবে পর্দার আড়ালে, দেশের ব্যাংক, রেল, টেলিকম, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং সরকারি পরিকাঠামোর ঘড়ি যে যার মতো চালানোর বদলে সবাইকে এক সূত্রে বাঁধার মধ্যে দিয়ে।

হঠাৎ কেন এই সিদ্ধান্ত?


এত দিন দেশের অধিকাংশ টেলিকম ও ইন্টারনেট পরিষেবা সংস্থা (ISP) সময় নির্ধারণের জন্য নির্ভর করত আমেরিকার নিয়ন্ত্রণাধীন জিপিএস (GPS) উপগ্রহ পরিষেবার উপরে। এখানেই লুকিয়ে নিরাপত্তার প্রশ্ন। ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় এই অতিরিক্ত বিদেশনির্ভরতার কারণে ভারতের সেনাবাহিনীকে ভুগতে হয়েছিল বলে বহু রিপোর্টে উঠে এসেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বিদেশি উপগ্রহের বদলে দেশীয় প্রযুক্তিতে সময় নির্ধারণের ভাবনা জোরদার হয়।

এ বার থেকে দিল্লির কাছে ফরিদাবাদের ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরির (NPL) অতি নিখুঁত পরমাণু ঘড়িই হয়ে উঠবে দেশের সময়ের আসল উৎস। সিজিয়াম-১৩৩ পরমাণুর কম্পন গুনে সময় মাপা এই ঘড়ি তিন কোটি বছরে মাত্র এক সেকেন্ড এদিক-ওদিক হয়। জিপিএসের বদলে সময় সঞ্চালনের কাজে ব্যবহৃত হবে ভারতের নিজস্ব উপগ্রহ পরিভ্রমণ ব্যবস্থা ন্যাভিক (NavIC)।

কী ভাবে সবাই জানবে?

দিল্লির ওই কেন্দ্রীয় ঘড়ি থেকে অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে সঠিক সময় পৌঁছে যাবে আহমেদাবাদ, বেঙ্গালুরু, ভুবনেশ্বর, ফরিদাবাদ ও গুয়াহাটির পাঁচটি রিজিওনাল রেফারেন্স স্ট্যান্ডার্ড ল্যাবরেটরিতে (RRSL)। প্রতিটি কেন্দ্রে বসানো থাকবে নিজস্ব পরমাণু ঘড়ি, যা আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে দেবে দেশের প্রকৃত সময়। এই প্রযুক্তির পোশাকি নাম হোয়াইট র‍্যাবিট (White Rabbit), চলতি বছরের জুলাই মাসে। যার সফল পরীক্ষা ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে বেঙ্গালুরুর কেন্দ্রে। ব্যাংকিং, টেলিকম, বিদ্যুৎ, পরিবহণ ও ডিজিটাল প্রশাসন, একাধিক ক্ষেত্রে এই পরীক্ষায় সাফল্য মিলেছে বলে দাবি ভোক্তা বিষয়ক দফতরের।

নিয়ম অনুযায়ী, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১৮০ দিন পর অর্থাৎ মোটামুটি ২০২৭ সালের মার্চ নাগাদ পুরোপুরি কার্যকর হবে এই ব্যবস্থা। ততদিনে সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের ডিজিটাল পরিকাঠামো নতুন সময় মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিদ্যা বা জাহাজ চলাচলের কাজে সরকারি অনুমতি সাপেক্ষে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য কী তাৎপর্য?

কলকাতা দেশের অন্যতম প্রাচীন শহর। এই শহরেও ব্যাংক, স্টক লেনদেন কিংবা ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় প্রতিটি লেনদেনের সময় মাইক্রোসেকেন্ড হিসেবে নথিবদ্ধ হয়। সেই নির্ভুলতার প্রশ্নে এই নতুন কেন্দ্রীভূত সময় ব্যবস্থা রাজ্যের ব্যাংকিং ও আইটি শিল্পের জন্য সরাসরি প্রাসঙ্গিক। ইস্টার্ন রেলওয়ে, কলকাতা মেট্রো এবং রাজ্যের ডিজিটাল প্রশাসনিক পরিষেবাগুলিকেও নতুন সময় মান মেনে চলতে হবে আগামী দিনে।

উল্লেখ্য, উত্তরবঙ্গের কোচবিহার বা আলিপুরদুয়ারের মতো এলাকায় সূর্যোদয় হয় রাজ্যের বাকি অংশের তুলনায় অনেক আগেই, অনেকটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মতো। বহু বছর ধরে উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য পৃথক সময় অঞ্চলের দাবি উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। এক দেশ, এক সময় নীতিতে অবশ্য গোটা দেশের জন্য একটিই সময় অঞ্চল রাখার পক্ষে জোর দেওয়া হয়েছে, যার জেরে এই ধরনের আঞ্চলিক দাবিগুলি নিয়ে আলোচনা আরও একবার সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

সবমিলিয়ে, আপনার দৈনন্দিন জীবনে চোখে পড়ার মতো কোনও পরিবর্তন না হলেও দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বনির্ভরতার প্রশ্নে এক দেশ এক সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল।