নিট-ইউজি (NEET-UG) বিতর্কে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের চাপে ইস্তফা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তার ঠিক পরের দিন, রবিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঘোষণা করেছেন এক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্ক ফোর্স (Task Force) গঠনের কথা। যে টাস্ক ফোর্সের দায়িত্ব দেশের গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতীয় পরীক্ষা সংস্থা তথা এনটিএ-কে (NTA) স্বচ্ছ, নির্ভরযোগ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলতেই ছয় সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি হয়েছে। যাঁরা পড়ুয়াদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলা করেছেন, তাঁদের জেলে পাঠানো হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
নেতৃত্বে আধার-স্থপতি নীলেকণি
এই টাস্ক ফোর্সের মাথায় বসানো হয়েছে ইনফোসিসের (Infosys) সহপ্রতিষ্ঠাতা নন্দন নীলেকণিকে। আধার (Aadhaar) প্রকল্পের অন্যতম স্থপতি হিসেবে পরিচিত নীলেকণি ভারতের ডিজিটাল পরিকাঠামো তৈরির নেপথ্য কারিগরদের অন্যতম। প্রযুক্তিবিদ হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরীক্ষা ব্যবস্থার জন্য সম্পূর্ণ সুরক্ষিত এনক্রিপ্টেড (End-to-end Encrypted) প্ল্যাটফর্ম তৈরির ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কৌতূহলের বিষয়, ২০০৯ সালে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নীলেকণি মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রকের (HRD Ministry) দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যদিও তখন তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রায় দেড় দশক পরে এ বার শিক্ষা সংস্কারের রাশ তাঁর হাতেই তুলে দিল কেন্দ্রীয় সরকার।
বাকি সদস্যরা
নীলেকণির পাশাপাশি কমিটিতে রয়েছেন ইসরোর (ISRO) প্রাক্তন চেয়ারম্যান এস সোমনাথ, যিনি চন্দ্রযান-৩ (Chandrayaan-3) অভিযানের নেপথ্য কারিগর। জটিল ও ত্রুটিহীন ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি পরীক্ষা পরিচালনার নিখুঁত প্রশাসনিক প্রয়োগ নিয়ে কাজ করতে পারেন বলে ধারণা। কমিটিতে রয়েছেন গোয়েন্দা ব্যুরোর (Intelligence Bureau) প্রাক্তন অধিকর্তা তপন ডেকাও, যাঁর ঝুলিতে জম্মু-কাশ্মীর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাসদমন অভিযান তথা ২৬/১১ মুম্বই হামলার তদন্তের অভিজ্ঞতা। প্রশ্নফাঁস রুখতে নিরাপত্তা কাঠামো মজবুত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে।
আইআইটি মাদ্রাজের (IIT Madras) অধিকর্তা ভি কামাকোটিও রয়েছেন এই তালিকায়। কম্পিউটার বিজ্ঞানী কামাকোটি সাইবার নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি-নির্ভর প্রশ্নপত্র প্রণয়নের প্রশ্নে কমিটিকে দিশা দেখাবেন বলেই মত পর্যবেক্ষকদের। এ ছাড়া রয়েছেন সিবিএসই-র (CBSE) প্রাক্তন চেয়ারপার্সন তথা স্কুলশিক্ষা সচিব অনিতা কারওয়াল, যিনি জাতীয় শিক্ষানীতি (National Education Policy) প্রণয়নের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। বিহারের প্রাক্তন মুখ্যসচিব তথা লজিস্টিক্স বিশেষজ্ঞ অমৃত লাল মিনাকে রাখা হয়েছে প্রশ্নপত্র ছাপাখানা থেকে পরীক্ষাকেন্দ্র পর্যন্ত নিরাপদ সরবরাহ শৃঙ্খল নিশ্চিত করার দায়িত্বে।
সংসদে কড়া বিল
টাস্ক ফোর্স গঠনের পাশাপাশি সোমবারই লোকসভায় পেশ হয়েছে গণপরীক্ষা (অসদুপায় প্রতিরোধ) সংশোধনী বিল, ২০২৬ (Public Examinations Prevention of Unfair Means Amendment Bill 2026)। প্রতিটি রাজ্যে দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ আদালত (Fast-track Courts) গঠন এবং দু’মাসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার প্রস্তাব রয়েছে বিলে। প্রশ্নফাঁসে জড়িতদের জন্য সর্বোচ্চ দশ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লক্ষ টাকা জরিমানার সংস্থান রাখা হয়েছে। সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে যা বেড়ে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
এই সংস্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ
এনটিএ পরিচালিত নিট, জেইই মেন (JEE Main) কিংবা সিইউইটি-র (CUET) মতো পরীক্ষায় প্রতি বছর বাংলা থেকেও লক্ষাধিক পরীক্ষার্থী অংশ নেন। প্রশ্নফাঁস বিতর্কে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব সরাসরি পড়েছিল রাজ্যের ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিং প্রার্থীদের উপরেও। এই আবহে কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন বিল নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন বিজেপি নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তাঁর মতে, এই আইন প্রশ্নফাঁসে স্থায়ী রাশ টানতে সাহায্য করবে। তবে বিরোধী শিবিরের একাংশের প্রশ্ন, দিল্লিতে ছাত্র বিক্ষোভে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ নিয়ে সংসদে আলোচনার দাবি তোলা হলেও, তার নিষ্পত্তি না করেই কেন্দ্র নতুন কমিটি ও বিল দিয়ে বিষয়টি সামলাতে চাইছে। বিতর্ক যাই থাক, রাজ্যের শিক্ষা মহলের একাংশের অবশ্য বক্তব্য, নীলেকণির প্রযুক্তিনির্ভর সংস্কার বাস্তবায়িত হলে আগামী দিনে নিট বা জেইই-র মতো পরীক্ষায় বাংলার পড়ুয়াদের ভরসা কিছুটা হলেও ফিরতে পারে।