Explained: দেশের প্রথম বুলেট ট্রেন নিয়ে বড় আপডেট: ঘোষণা হয়ে গেল শুরুর দিন-রুট, বাংলারও সুদিন

First Bullet Train In India (AI Imagination)

দেশের প্রথম বুলেট ট্রেন (Bullet Train) প্রকল্প এখন আর শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নেই। মুম্বই-আমদাবাদ হাই-স্পিড রেল করিডরের (Mumbai-Ahmedabad High Speed Rail বা MAHSR) নির্মাণকাজ ইতিমধ্যেই প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ। জাপানের শিনকানসেন (Shinkansen) প্রযুক্তির উপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রকল্প শুধু দুই শহরের মধ্যে যাতায়াতের সময় কমাবে না, গোটা দেশে হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক তৈরির পথও প্রশস্ত করবে বলে মনে করছে রেল মন্ত্রক।

প্রথম যাত্রা কবে, কোন রুটে

চলতি বছরের জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব জানিয়েছিলেন, মুম্বই-আমদাবাদ করিডরের প্রথম অংশ চালু হতে পারে ২০২৭ সালের ১৫ আগস্ট। প্রথম ধাপে সুরাত থেকে বিলিমোরার মধ্যে যাত্রী পরিষেবা শুরু হবে। এর পর ধাপে ধাপে খোলা হবে ভাপি-সুরাত, ভাপি-আমদাবাদ, আমদাবাদ-থানে এবং সবশেষে সম্পূর্ণ আমদাবাদ-মুম্বই রুট। সব মিলিয়ে গোটা ৫০৮ কিলোমিটার পথে থাকছে ১২টি স্টেশন, যা মহারাষ্ট্র, গুজরাত এবং দাদরা ও নগর হাভেলির মধ্যে দিয়ে যাবে।


স্পিড ও টাইম

মুম্বই থেকে আমদাবাদ পৌঁছতে সীমিত স্টপেজের এই ট্রেনে সময় লাগবে মাত্র ১ ঘণ্টা ৫৮ মিনিট। আর যে ট্রেনগুলি বেশি স্টেশনে থামবে, সেগুলির সময় লাগবে প্রায় ২ ঘণ্টা ১৭ মিনিট। বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুতগামী তেজস এক্সপ্রেসে এই দূরত্ব পার হতে সময় লাগে সাড়ে ৬ ঘণ্টার বেশি। করিডরের নকশা অনুযায়ী সর্বোচ্চ গতিবেগ ৩৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা রাখা হলেও পরিচালনগত গতিবেগ থাকবে ৩২০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা পর্যন্ত।

ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিস্ময়

এই প্রকল্পের অন্যতম চর্চিত অংশ মুম্বইয়ের কাছে তৈরি হওয়া সমুদ্রের নীচের সুড়ঙ্গ, যা দেশের প্রথম আন্ডারসি রেল টানেল হতে চলেছে। মোট ২১ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের মধ্যে ৭ কিলোমিটার থাকবে সমুদ্রের তলদেশে। ইতিমধ্যে ১৭টি সেতুর কাজ শেষ হয়েছে, চলছে এলিভেটেড ভায়াডাক্ট ও অন্যান্য জটিল নির্মাণকাজও। ভূমিকম্প শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ট্রেন সুরক্ষা প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলিও যুক্ত হচ্ছে শিনকানসেনের নিরাপত্তা মডেল অনুসরণ করে।

বুলেট-বিপ্লবের রুটম্য়াপ (SNS)

দেশীয় প্রযুক্তির ট্রেন

২০২৪ সালে চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি (Integral Coach Factory বা ICF) এবং ভারত আর্থ মুভার্স লিমিটেডের (Bharat Earth Movers Limited বা BEML) মধ্যে চুক্তি হয়েছিল দেশীয় প্রযুক্তিতে দুটি বুলেট ট্রেন তৈরির জন্য। বন্দে ভারত এক্সপ্রেসের নকশার আদলে তৈরি এই ট্রেনগুলি গড়ে ২৫০ কিলোমিটার এবং সর্বোচ্চ ২৮০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে ছুটতে সক্ষম হবে বলে জানা গিয়েছে। প্রতিটি কোচের খরচ পড়ছে প্রায় ২৭ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা, এবং প্রথম প্রোটোটাইপের ট্রায়াল শুরু হওয়ার কথা চলতি বছরের শেষ দিকে।

প্রতিবন্ধকতা

প্রকল্পের খরচ নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব ও জমির দাম বৃদ্ধির কারণে মূল বাজেট থেকে খরচ প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে বলে সূত্রের খবর। চিন থেকে আসা টানেল বোরিং মেশিন শুল্ক দপ্তরে আটকে থাকা এবং জাপানের সঙ্গে ঋণ বিষয়ক জটিলতাও কাজের গতি কিছুটা ব্যাহত করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

৭টি নতুন করিডর

আপাতত মুম্বই-আমদাবাদ রুট শুধু শুরু হচ্ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে কেন্দ্র সরকার আরও ৭টি হাই-স্পিড রেল করিডরের ঘোষণা করেছে, যেগুলির মধ্যে রয়েছে মুম্বই-পুণে, পুণে-হায়দরাবাদ, হায়দরাবাদ-বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ-চেন্নাই, চেন্নাই-বেঙ্গালুরু, দিল্লি-বারাণসী এবং বারাণসী-শিলিগুড়ি। প্রায় ৪০০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরগুলির জন্য মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ১৬ লক্ষ কোটি টাকা।

পশ্চিমবঙ্গের জন্য পরিকল্পনা

পূর্ব ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর বারাণসী-শিলিগুড়ি করিডর নিয়ে, যা এই বাজেটেই ঘোষণা হয়েছে। লখনউ, বারাণসী ও পাটনা হয়ে এই রুট শেষ হবে উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে, এবং দিল্লি-বারাণসী করিডরের সঙ্গে যুক্ত হলে দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি পৌঁছনো সম্ভব হবে মাত্র ৬ ঘণ্টায়, যা এখনকার তুলনায় বিরাট সময় সাশ্রয়। এর পাশাপাশি রয়েছে আরও একটি পরিকল্পনা, বারাণসী-হাওড়া হাই-স্পিড করিডর, যা এখনও বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্টের (Detailed Project Report বা DPR) পর্যায়ে। ৭৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট বক্সার, আরা, পাটনা, গয়া হয়ে সরাসরি ঢুকবে বাংলার শিল্পাঞ্চলে। ছুঁয়ে যাবে আসানসোল, দুর্গাপুর, বর্ধমানের মতো শহর এবং শেষ হবে হাওড়ায়। প্রস্তাবিত সর্বোচ্চ গতিবেগ ৩৫০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা ধরা হলেও, প্রকল্পটি এখনও সমীক্ষার স্তরে থাকায় বাস্তবে ২০৩০ সালের আগে কাজ শুরু সম্ভব নয় বলেই মত পর্যবেক্ষকদের।

কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণ

জাতীয় স্তরে হাই-স্পিড রেলের এই উদ্যোগের পাশাপাশি কলকাতা মেট্রো নেটওয়ার্কও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ পরিষেবা ২০২৭ সালের মধ্যে ১৩০ কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গ্রিন, অরেঞ্জ ও পার্পল লাইন সম্পূর্ণ হলে হাওড়া, মধ্য কলকাতা, আইটি হাব এবং বিমানবন্দরের মধ্যে সংযোগ আরও মজবুত হবে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। উত্তরবঙ্গমুখী হাই-স্পিড সংযোগ চালু হলে ডুয়ার্স ও দার্জিলিং পাহাড়ে পর্যটনের ক্ষেত্রেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সতর্কতা

উল্লেখ্য, ভারতের হাই-স্পিড রেল প্রকল্পগুলির ইতিহাসে সময়সীমা পিছিয়ে যাওয়ার নজির বহু বার দেখা গিয়েছে। মুম্বই-আমদাবাদ করিডরের ক্ষেত্রেও সময়সীমা একাধিক বার সংশোধন করতে হয়েছে। তাই ২০২৭ সালের আগস্টের যে সময়সীমার কথা বলা হচ্ছে, তা এখনও প্রস্তাবিত এবং নির্মাণকাজের অগ্রগতির উপর নির্ভরশীল বলেই মনে করা শ্রেয়। বারাণসী-হাওড়া করিডরের ক্ষেত্রে যেমন সময়সীমা নিয়ে এখনও সরকারি স্তরে কোনও স্পষ্ট ঘোষণাই হয়নি।