সৌদি আরব, তুর্কিয়ে আর পাকিস্তান হাত মিলিয়ে গড়েছে এক নতুন প্রতিরক্ষা জোট। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Mecca Joint Defence Agreement)। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা এর নাম দিয়েছেন… ইসলামিক ন্যাটো (Islamic NATO)। আর এই জোটেই এবার নাম লেখানোর ইঙ্গিত দিচ্ছে বাংলাদেশ। খবর সামনে আসতেই কপালে ভাঁজ পড়েছে নয়াদিল্লির। কারণ, প্রতিবেশী দেশ যদি সত্যিই এই সামরিক জোটের অংশ হয়ে যায়, তা হলে ভারতের পূর্ব সীমান্তে বদলে যেতে পারে ভূরাজনৈতিক সমীকরণ।
মক্কা চুক্তিতে কী আছে
গত ৭ আগস্ট মক্কায় সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন, তুর্কিয়ের প্রেসিডেন্ট রেচেপ তায়িপ এর্দোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সই করেছেন এই চুক্তিতে। ন্যাটোর পঞ্চম ধারার (Article 5) আদলে তৈরি এই চুক্তির মূল কথা, তিন দেশের যে কোনও একটির উপর হামলা হলে, তা ধরে নেওয়া হবে বাকি দুই দেশের উপরেও হামলা হয়েছে বলে।
তিন দেশের ভূমিকাও ভাগ করা আছে স্পষ্ট করে। সৌদি আরব জোগাচ্ছে অর্থ। তুর্কিয়ে দিচ্ছে প্রযুক্তি, বায়কার আকিঞ্চি (Baykar Akinci) ড্রোন থেকে শুরু করে কান (KAAN) স্টেলথ যুদ্ধবিমান প্রকল্প পর্যন্ত। আর পাকিস্তান জোগাচ্ছে সেনাবল। এই প্রস্তাবনা মোতাবেক আগেই পাকিস্তান সৌদি ভূখণ্ডে মোতায়েন করেছে জেএফ-১৭ (JF-17) যুদ্ধবিমান এবং চিনা এইচকিউ-৯ (HQ-9) বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ঢাকার নতুন কৌশল
শেখ হাসিনার পতনের পরে বাংলাদেশের বিদেশনীতিতে বড়সড় বদল এসেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (Bangladesh Nationalist Party) সরকার এখন অনুসরণ করছে বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতি। লক্ষ্য একটাই, ভারতের উপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন কৌশলগত সঙ্গী খোঁজা।
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, সৌদি আরব, তুর্কিয়ে ও পাকিস্তানের সঙ্গী হয়ে কোনও অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যোগ দিতে ঢাকার আপত্তি নেই। দেখতে হবে, সেই কাঠামো বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ হয়। এরই মধ্যে সৌদি যুবরাজের তরফে ঢাকায় পৌঁছেছে তারেক রহমানকে রিয়াধ সফরের ব্যক্তিগত আমন্ত্রণ। বাংলাদেশ যোগও দিয়েছে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন ১৪ দেশের মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্সে (Multinational Maritime Defence Alliance)।
তুর্কিয়ের সংবাদমাধ্যম, বিশেষত এর্দোয়ান ঘনিষ্ঠ ইয়েনি শাফাক (Yeni Şafak), বহুদিন ধরেই বাংলাদেশকে মক্কা চুক্তির আওতায় নিয়ে আসার পক্ষে সরব। কারণ পরিষ্কার, বিপুল মুসলিম জনসংখ্যা আর বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানের জেরে বাংলাদেশ তুর্কিয়ের অস্ত্র রপ্তানির লোভনীয় বাজার।
শিলিগুড়ি করিডর
দশকের পর দশক ধরে ভারতের পূর্ব সীমান্ত রয়েছে তুলনামূলক ভাবে শান্ত। ফলে সেনাবাহিনী মূল নজর দিতে পেরেছে পাকিস্তান সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখা (LoC) আর চিন সীমান্তের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় (LAC)। কিন্তু বাংলাদেশ যদি সত্যিই ঝুঁকে পড়ে পাকিস্তান-তুর্কিয়ে জোটের দিকে, বদলে যেতে পারে সেই সমীকরণ।
সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা শিলিগুড়ি করিডর (Siliguri Corridor) বা চিকেনস নেক (Chicken’s Neck)। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিকে জুড়ে রাখা এই সরু ভূখণ্ডের প্রস্থ সবচেয়ে সংকীর্ণ জায়গায় মাত্র ২২ কিলোমিটার। অতীতে উত্তর-পূর্বের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলি বাংলাদেশ সীমান্তে আশ্রয় নিয়েছে বলে বারবার অভিযোগ উঠেছে। ইসলামাবাদ ও ঢাকার মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য আদানপ্রদান নতুন করে জোরদার হলে, ফের অস্থিরতা ফিরতে পারে এই এলাকায়।
বঙ্গোপসাগরও (Bay of Bengal) ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু। বিশাখাপত্তনমের পূর্ব নৌ কমান্ড এবং আন্দামান-নিকোবরের সামরিক পরিকাঠামো ঘিরেই তৈরি ভারতের অ্যাক্ট ইস্ট (Act East) নীতি। বাংলাদেশ যদি তুর্কিয়ের রণতরী কিংবা পাকিস্তানি সেনাকে ডকিং বা যৌথ মহড়ার সুযোগ দেয়, তা হলে বঙ্গোপসাগর আর ভারতের নিরাপদ প্রাঙ্গণ থাকবে না।
আদৌ সহজ?
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বাংলাদেশের পক্ষে পূর্ণ সদস্যপদ নেওয়া মোটেই সহজ নয়। ঢাকার বিদেশনীতির ভিত্তি বরাবরই সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়। কোনও একটি রাষ্ট্রের উপর হামলা হলে যুদ্ধে জড়ানোর মতো বাধ্যবাধকতার শর্ত মেনে নিলে, তা হবে এই ঐতিহ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত।
তা ছাড়া ইউরোপ ও আমেরিকায় পোশাক রপ্তানি, ভারতের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিবহনের মতো বাণিজ্যিক সম্পর্কের উপরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকে আছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতে জড়িয়ে পড়া কিংবা ভারত-বিরোধী কোনও শিবিরে নাম লেখানো, বাংলাদেশের পক্ষে আর্থিক দিক থেকেও ঝুঁকিপূর্ণ। মিশরের উদাহরণ রয়েইছে। একই কারণে তুর্কিয়ের আমন্ত্রণ সত্ত্বেও তারা ইসলামিক ন্যাটোয় নাম লেখায়নি। কূটনৈতিক মহলের অভিমত, পূর্ণাঙ্গ জোটে ঢোকার বদলে বাংলাদেশও সম্ভবত বেছে নেবে সীমিত প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পথ।
চিনের চোখ
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী দেশ চিন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (Belt and Road Initiative) আওতায় ঢাকায় বিপুল বিনিয়োগও রয়েছে বেজিংয়ের। তুরস্ক-পাকিস্তানের প্রভাব বাড়লে চিনা অস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে ঠিকই, কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতিতে যে কোনও পদক্ষেপ যদি ভারতের উপর চাপ বাড়াতে কার্যকরী ভূমিকা নেয়, তাতে বেজিংয়ের বিশেষ আপত্তি থাকার কোনও কারণ নেই।
যদিও বিশেষজ্ঞদের অনুমান, বাংলাদেশ বেছে নেবে মাঝামাঝি পথ। সৌদির আমন্ত্রণ আর তুর্কিয়ের অস্ত্রভাণ্ডার কাজে লাগিয়ে সেনা আধুনিকীকরণ করবে ঢাকা, কিন্তু বাঁধা পড়বে না কোনও পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোটে। তবু এই পুরো প্রক্রিয়াটাই যে দিল্লির কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা মহলের চিন্তা বাড়িয়ে দিয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই।