দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। বুধবার, ১৫ জুলাই থেকে কার্যকর হয়ে গেল ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে স্বাক্ষরিত ব্যাপক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চুক্তি [Comprehensive Economic and Trade Agreement, CETA]। ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই লন্ডনে বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়াল এবং ব্রিটিশ প্রতিপক্ষ জোনাথন রেনল্ডসের হাত ধরে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এই চুক্তি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের উপস্থিতিতে সম্পন্ন এই বাণিজ্য বন্দোবস্ত এক বছর পর অবশেষে এ বার বাস্তবায়িত হল। ব্রিটেনের নতুন ইস্পাত আমদানি নীতি নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও জি৭ সম্মেলনের ফাঁকে মোদী ও স্টারমারের বৈঠকের পর নির্ধারিত দিনেই কার্যকর হয়েছে চুক্তি। মোদী সরকারের আমলে এটি ষষ্ঠ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। এর আগে মরিশাস, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, অস্ট্রেলিয়া, European Free Trade Association বা EFTA এবং ওমানের সঙ্গে একই ধরনের চুক্তি করেছে ভারত। ঠিক কী কী বদলাচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনে এবং পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায় কতটা প্রভাব পড়বে, তারই একটি খতিয়ান রইল দশ দফায়।
১. স্কচ হুইস্কি ও জিন সস্তা
সবচেয়ে বড় লাভের মুখ দেখছেন মদ্যপায়ীরা। এত দিন ব্রিটেন থেকে আসা স্কচ হুইস্কি এবং জিনের উপর আমদানি শুল্ক ছিল ১৫০ শতাংশ। চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা নেমে এসেছে ৭৫ শতাংশে। আগামী দশ বছরে ধাপে ধাপে এই শুল্ক আরও কমে দাঁড়াবে ৪০ শতাংশে। শিল্পমহলের একাংশের অনুমান, প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের স্কচের দাম পাঁচ থেকে দশ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। তবে চূড়ান্ত দাম নির্ভর করবে রাজ্যের আবগারি শুল্ক, ডিস্ট্রিবিউটরদের কমিশন এবং ব্র্যান্ডের নিজস্ব বিপণন কৌশলের উপরেও।
২. গাড়ি ও ট্রাক কিনতে খরচ কমবে
প্রথমবার কোনও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে সম্পূর্ণ তৈরি গাড়ি ও ট্রাকের আমদানি শুল্কে বড় ছাড় দিয়েছে ভারত। পেট্রল ও ডিজেলচালিত গাড়ির উপর শুল্ক ধাপে ধাপে ১১০ শতাংশ থেকে নেমে আসবে ১০ শতাংশে, তবে তা কার্যকর হবে নির্দিষ্ট কোটার মধ্যেই। প্রথম ১৫ বছরে সাড়ে তিন লক্ষেরও বেশি গাড়ি আমদানির অনুমতি মিলবে ছাড়ের হারে। বৈদ্যুতিক, হাইব্রিড ও হাইড্রোজেনচালিত যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে অবশ্য ছাড় মিলবে শুধু ষষ্ঠ বছর থেকে, দেশীয় [electric vehicle, EV] শিল্পকে সুরক্ষা দিতেই এই সিদ্ধান্ত। ট্রাকের ক্ষেত্রে বর্তমান ৪৪ শতাংশ শুল্ক পঞ্চম বছরে নেমে দাঁড়াবে সাড়ে আট শতাংশে। রোলস রয়েস, অ্যাস্টন মার্টিন, ম্যাকলারেন কিংবা জাগুয়ার-ল্যান্ড রোভারের মতো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলি ইতিমধ্যেই কিছু মডেলে দাম কমানো শুরু করেছে।
৩. চকোলেট-প্রসাধনী থেকে বিস্কুট, আরও যা সস্তা
শুধু মদ বা গাড়ি নয়, ব্রিটেন থেকে আসা চকোলেট, মিষ্টি বিস্কুট, নরম পানীয় এবং প্রসাধনী সামগ্রীর উপরেও শুল্ক কমছে ধীরে ধীরে। তবে বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পণ্যগুলির দাম রাতারাতি কমবে না, পরিবহন খরচ, মুদ্রার বিনিময় হার, Goods and Services Tax বা GST এবং খুচরো বিক্রেতার লভ্যাংশের উপরেও নির্ভর করবে চূড়ান্ত দাম।
৪. রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক
চুক্তির জেরে সবচেয়ে বড় জয় ভারতের রপ্তানিকারীদের জন্য। ভারতের প্রায় ৯৯ শতাংশ রফতানি পণ্যই এ বার শূন্য শুল্কে ঢুকতে পারবে ব্রিটিশ বাজারে। বস্ত্র ও পোশাকের উপর ব্রিটেনের ১২ শতাংশ শুল্ক পুরোপুরি উঠে যাচ্ছে, চামড়া ও জুতোর উপর ১৬ শতাংশ, মৎস্য ও সামুদ্রিক পণ্যে সাড়ে ২১ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে। তিরুপুর, সুরাত, লুধিয়ানা, ভাদোহির মতো বস্ত্রশিল্প কেন্দ্রগুলি এত দিন বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা কম্বোডিয়ার তুলনায় শুল্কগত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ছিল, এ বার সেই ফারাক ঘুচবে বলে আশাবাদী শিল্পমহল। রত্ন ও গয়না রপ্তানিতেও মিলবে শুল্কমুক্ত সুবিধা।
৫. পশ্চিমবঙ্গের ঝুলিতে কী
কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রক প্রকাশিত রাজ্যভিত্তিক তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের জন্য উল্লেখযোগ্য জায়গা পেয়েছে দার্জিলিং চা, বালুচরী শাড়ি, শান্তিনিকেতনের চামড়াজাত সামগ্রী এবং নতুনগ্রামের কাঠের পুতুল। ভৌগোলিক নির্দেশক বা [Geographical Indication, GI] তকমাধারী দার্জিলিং চায়ের জন্য যৌথ স্বীকৃতি উদ্যোগও রয়েছে চুক্তিতে, স্কচ হুইস্কির পাশাপাশি। ডুয়ার্স ও তরাইয়ের চা বাগানগুলির জন্যও এটি সুখবর, কারণ প্রক্রিয়াজাত চায়ের উপর ব্রিটিশ শুল্ক তুলে নেওয়া হচ্ছে সম্পূর্ণ। এ ছাড়া কলকাতার বানতলা ও তপসিয়া কেন্দ্রিক চামড়া শিল্পও চামড়াজাত পণ্যে শুল্ক ছাড়ের সরাসরি সুবিধাভোগীদের তালিকায় থাকছে, উত্তরপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর পাশাপাশি।
৬. পেশাদারদের জন্য বড় স্বস্তি
ব্রিটেনে কর্মরত ভারতীয়দের জন্য চুক্তিতে রাখা হয়েছে ডাবল কনট্রিবিউশন কনভেনশন Double Contribution Convention বা DCC নামে একটি বিশেষ ব্যবস্থা। এর ফলে সাময়িকভাবে ব্রিটেনে কর্মরত ভারতীয়দের দুই দেশেই সামাজিক সুরক্ষা খাতে টাকা জমা দিতে হবে না। সরকারি হিসেব অনুযায়ী পঁচাত্তর হাজারেরও বেশি ভারতীয় পেশাদার এবং ন’শোর বেশি সংস্থা উপকৃত হবে এই ব্যবস্থায়, সাশ্রয় হবে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা। তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা, স্বাস্থ্য, প্রকৌশল, এমনকি রাঁধুনি বা যোগ প্রশিক্ষকদের মতো পেশাতেও সাময়িক কাজের সুযোগ মিলবে সহজে।
৭. ইস্পাত নিয়ে জট কেটেছে
চুক্তি কার্যকর হওয়ার ঠিক আগে ব্রিটেনের নতুন ইস্পাত আমদানি নিয়ন্ত্রণ নীতি ঘিরে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। ব্রিটেনের এই নীতি ১ জুলাই থেকেই কার্যকর হয়ে যাওয়ায় ভারতের প্রায় ৯০ কোটি ডলার মূল্যের ইস্পাত রপ্তানি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৭ শতাংশ। জি৭ সম্মেলনের ফাঁকে মোদী-স্টারমার বৈঠকের পরে উভয় দেশ ইস্পাত বাণিজ্যে সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছয়, ফলে নির্ধারিত দিনেই কার্যকর করা সম্ভব হয় চুক্তি।
৮. চুক্তির বাইরে যে সব পণ্য
সব ক্ষেত্রেই যে দরজা খুলে দেওয়া হয়েছে, তা নয়। দুগ্ধজাত পণ্য, খাদ্যশস্য, বাজরা জাতীয় শস্য, ডাল, ভোজ্য তেল, আপেল, সোনা, হিরে, স্মার্টফোন, অপটিক্যাল ফাইবার এবং জ্বালানি সংক্রান্ত স্পর্শকাতর পণ্যকে সচেতনভাবেই চুক্তির বাইরে রেখেছে ভারত। দেশীয় কৃষক ও উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষার কথা মাথায় রেখে। Make in India প্রকল্পের আওতাধীন ক্ষেত্রগুলিতেও শুল্ক ছাড় কার্যকর হবে ৫, ৭ বা ১০ বছরের দীর্ঘ সময় ধরে, একসঙ্গে নয়।
৯. লক্ষ্য কত বড়
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৫৬ বিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ১২০ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য স্থির করেছে দুই সরকার। ব্রিটিশ সরকারের হিসেব অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় উৎপাদনের বা জিডিপি ০.১৩ শতাংশ বাড়তে পারে। তবে ব্রিটেনের সংসদীয় কমিটির একাংশ মনে করিয়ে দিয়েছে, চুক্তির প্রকৃত সুফল নির্ভর করছে তার বাস্তবায়নের উপরেই।
১০. ধৈর্য ধরতে হবে
আমদানি শুল্ক কমলেই যে দোকানের তাকে সঙ্গে সঙ্গে দাম কমে যাবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ওষুধ, রাসায়নিক, প্লাস্টিক বা ধাতব পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় মিললেও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, প্রযুক্তিগত মানদণ্ড এবং শংসাপত্রের জটিলতা এখনও বড় বাধা হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ শুল্ক কমাই যথেষ্ট নয়, রপ্তানি বাড়াতে গেলে জোগান ব্যবস্থা এবং মান নিয়ন্ত্রণেও বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে ভারতীয় সংস্থাগুলির।
সব মিলিয়ে ভারত-ব্রিটেন বাণিজ্য চুক্তি ব্রেক্সিট পরবর্তী পর্বে ব্রিটেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিগুলির অন্যতম বলেই মনে করছে সে দেশের সংসদীয় ব্যবসা ও বাণিজ্য কমিটি। ভারতের দিক থেকে দেখলে এই চুক্তি বাংলার চা বাগান থেকে চামড়া শিল্প, বহু ক্ষেত্রেই নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে, তবে তার পুরো ফায়দা তুলতে আর একটু সময় লাগবে বলেই মত অর্থনীতিবিদদের।