Explainer: ভারতের আকাশ থেকে ফের গায়েব সমস্ত মেঘ, নতুন উপগ্রহচিত্র কেন অশনি সংকেত?

ভারতের আকাশ থেকে উধাও মেঘ (Pic-Windy)

জুনের গোড়ায় স্বাভাবিক সময়েই কেরালামে ঢুকে বেশ ভালোই প্রভাব বিস্তার করছিল দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু (southwest monsoon)। কিন্তু জুন গড়াতেই ছন্দ কাটল, এবং জুলাইয়ের মাঝামাঝি এসেও সেই খামখেয়ালিপনা কাটছে না দেশের অনেক জায়গায়। উপগ্রহচিত্রে দেখা যাচ্ছে, ভারতের আকাশ থেকে প্রায় গায়েব হয়ে গিয়েছে বর্ষার মেঘপুঞ্জ। ভারতীয় আবহাওয়া দফতরের (India Meteorological Department, IMD) পর্যবেক্ষণ বলছে, এর পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে বহু দূরের প্রশান্ত মহাসাগরের (Pacific Ocean) কয়েকটি শক্তিশালী টাইফুনের (typhoon), যেগুলি নিজেদের অজান্তেই কার্যত ভারতের বর্ষার শক্তি টেনে নিয়েছে নিজেদের দিকে।

প্রশান্ত মহাসাগরের ঝড়ের সঙ্গে ভারতের বৃষ্টির সম্পর্ক

সাধারণত বঙ্গোপসাগরে (Bay of Bengal) তৈরি হওয়া নিম্নচাপ (low pressure area) মৌসুমি বায়ুকে দেশের ভিতরে টেনে আনার প্রধান ইঞ্জিনের কাজ করে। কিন্তু জুন মাসে বঙ্গোপসাগরে একটিও সংগঠিত মৌসুমি সিস্টেম তৈরি হয়নি। আবহবিদদের একাংশের ব্যাখ্যা, প্রশান্ত মহাসাগরে একের পর এক টাইফুন যেমন মেখালা এবং হিগোস তৈরি হওয়ায়, যে বায়ুমণ্ডলীয় শক্তি স্বাভাবিক ভাবে বঙ্গোপসাগরের দিকে সঞ্চারিত হয়ে নিম্নচাপ তৈরি করত, তার অনেকটাই পূর্ব দিকে সরে গিয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের ওই ঘূর্ণিঝড়গুলির দিকে। ফলে মায়ানমার ও বঙ্গোপসাগরের বায়ুপ্রবাহে ব্যাঘাত ঘটে, আর বঙ্গোপসাগরের প্রয়োজনীয় নিম্নচাপ তৈরিই হয়নি সময়মতো।


একসঙ্গে সক্রিয় পাঁচ প্রতিকূল শক্তি

শুধু টাইফুনই নয়, আবহবিদেরা মৌসুমি বায়ুর এই থমকে যাওয়ার পিছনে চিহ্নিত করেছেন মোট পাঁচটি কারণকে। প্রথমত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে দানা বাঁধতে থাকা এল নিনোর (El Nino) প্রভাব, যা ঐতিহাসিক ভাবেই ভারতের মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দেয়। দ্বিতীয়ত এমজেও বা ম্যাডেন-জুলিয়ান অসিলেশন (Madden-Julian Oscillation), গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো মেঘ ও বৃষ্টির এই তরঙ্গ ভারত মহাসাগরের বদলে সক্রিয় রয়েছে অন্যত্র। তৃতীয়ত দুর্বল সোমালি জেট (Somali Jet), যার আসলে কথা আরব সাগরের শাখাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। চতুর্থত বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের অনুপস্থিতি, এবং পঞ্চমত ভারত মহাসাগরের নিরপেক্ষ ডাইপোল (Indian Ocean Dipole) পরিস্থিতি, যা মৌসুমি বায়ুকে বাড়তি কোনও সহায়তা দিতে পারছে না।

জুনে কতটা ঘাটতি হয়েছিল?

আইএমডির হিসেব অনুযায়ী চলতি বছরের জুন মাস ছিল ১৯০১ সালের পর পঞ্চম সবচেয়ে শুষ্ক জুন, যেখানে সারা দেশে বৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ কম। পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতে তো জুন মাসে বৃষ্টি হয়েছে ১৯০১ সালের পর সর্বনিম্ন, মাত্র ১৯৭.৫ মিলিমিটার। এই ঘাটতির জেরে খরিফ শস্যের বপন এবং বাঁধগুলির জলস্তর নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে দেশ জুড়ে।

জুলাইয়েও স্বস্তি নেই

আইএমডির সাম্প্রতিকতম পূর্বাভাস বলছে, জুলাইয়ে দেশের গড় বৃষ্টিপাত থাকতে পারে স্বাভাবিকের চেয়ে কম, অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি গড়ের (Long Period Average) ৯৪ শতাংশেরও নীচে। ১০ জুলাইয়ের বুলেটিনে আইএমডি স্পষ্ট জানিয়েছে, আগামী ৬ থেকে ৭ দিন মধ্য ও দক্ষিণ উপদ্বীপীয় ভারতে বৃষ্টির কার্যকলাপ থাকবে বেশ স্তিমিত।

উত্তরবঙ্গ ভিজলেও দক্ষিণবঙ্গে ঘাটতি

জাতীয় স্তরে এই খামখেয়ালি ছবির মধ্যেও পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট বৈপরীত্য। জুন মাস জুড়েই দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কালিম্পঙের মতো পার্বত্য ও তরাই এলাকায়, অর্থাৎ সাব-হিমালয়ান পশ্চিমবঙ্গে (Sub-Himalayan West Bengal), নিয়মিত ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। ১১ জুলাইয়ের সর্বশেষ বুলেটিনেও আইএমডি জানিয়েছে, ১১ ও ১২ জুলাই উত্তর-পূর্ব ভারতের পাশাপাশি সাব-হিমালয়ান পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে বিচ্ছিন্ন ভাবে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য দিকে কলকাতা-সহ দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলিতে তুলনামূলক ভাবে বৃষ্টি কিছুটা কম হয়েছে, যা জাতীয় স্তরের সামগ্রিক ঘাটতির সঙ্গেই সাযুজ্যপূর্ণ।

নতুন করে সক্রিয় হবে বর্ষা?

তবে দক্ষিণবঙ্গের জন্য একটি আশার কথাও শুনিয়েছে আইএমডি। সাপ্তাহিক পূর্বাভাস বলছে, আগামী সপ্তাহের প্রথমার্ধে অর্থাৎ ১৬ জুলাই নাগাদ উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে ওড়িশা ও পশ্চিমবঙ্গ উপকূল ঘেঁষে একটি ঘূর্ণাবর্ত এবং তার জেরে সম্ভাব্য নিম্নচাপ তৈরি হতে পারে। এই ধরনের সিস্টেমই সাধারণত দক্ষিণবঙ্গ-সহ পূর্ব ও মধ্য ভারতে মৌসুমি বায়ুকে নতুন করে চাঙ্গা করে তোলে। ফলে জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণবঙ্গেও বৃষ্টির ঘাটতি খানিকটা মিটতে পারে বলে আশাবাদী আবহবিদদের একাংশ।