ভারতীয়দের পাতে প্রোটিনের (protein) ঘাটতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন পুষ্টিবিদরা। সাম্প্রতিক একটি শিল্পরিপোর্ট (industry report) সেই উদ্বেগকেই আরও জোরালো করল। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতীয়দের দৈনিক খাদ্যতালিকায় ক্যালোরি পর্যাপ্ত থাকলেও প্রোটিনের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রোটিনের উৎস হিসেবে বারবার উঠে আসছে ডিমের নাম।
ভারতীয় চিকিৎসা গবেষণা পরিষদের (ICMR) জাতীয় পুষ্টি সংস্থা সুপারিশ করেছে, একজন মানুষের বছরে অন্তত ১৮০টি ডিম খাওয়া উচিত। অথচ বাস্তবে দেশের গড় মাথাপিছু ডিম খাওয়ার পরিমাণ বছরে ১০০ থেকে ১১০টির আশপাশে। অর্থাৎ প্রয়োজনের প্রায় অর্ধেকেরও কম। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন যতটা প্রয়োজন, ততটা প্রোটিন গ্রহণ করেন না। আমিষ ও নিরামিষ, দুই ধরনের খাদ্যাভ্যাসেই এই ঘাটতি স্পষ্ট।
তবে আশার কথা হল, সচেতনতা বাড়ছে ধীরে ধীরে। রিপোর্ট বলছে, গত কয়েক বছরে ভারতে ডিম খাওয়ার হার বার্ষিক ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে বেড়েছে। প্রোটিন-সমৃদ্ধ খাবারের চাহিদাও বাড়ছে হু হু করে, হুয়ে প্রোটিন (Whey Protein) থেকে শুরু করে হাই-প্রোটিন আইসক্রিম পর্যন্ত নানা পণ্যে সেই প্রবণতা স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ডিমে থাকে ৬ থেকে ৭ গ্রাম উচ্চমানের প্রোটিন, সঙ্গে ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি ১২, আয়রন ও জিঙ্কের মতো জরুরি উপাদান। এই কারণেই ডিমকে বলা হচ্ছে সাশ্রয়ী প্রোটিন ক্যাপসুল, যা শিশু ও গর্ভবতী মহিলাদের পুষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষিতে এই খবরটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দেশের মধ্যে ডিম উৎপাদনে বাংলার স্থান চতুর্থ। রাজ্যের হরিণঘাটা, রানাঘাট, টালিগঞ্জ ও মালদহের মতো এলাকায় গড়ে উঠেছে বড় পোলট্রি হাব। রাজ্য সরকারের পশুসম্পদ উন্নয়ন নিগমের (West Bengal Livestock Development Corporation) হরিণঘাটা খামার থেকেই প্রতিদিন প্রায় দু’লক্ষ ৬৫ হাজার ডিম উৎপাদিত হয়, যা শীঘ্রই দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের লক্ষ্য, চলতি অর্থবর্ষের মধ্যেই ডিম উৎপাদনে সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হওয়া। মিড-ডে মিল ও আইসিডিএস প্রকল্পে রাজ্যের বার্ষিক ডিমের চাহিদা প্রায় ১৪৪০ কোটি, যার একটা বড় অংশ এখন রাজ্যের নিজস্ব উৎপাদন থেকেই মিটছে।
গ্রামীণ বাংলায় ব্যাকইয়ার্ড পোলট্রি প্রকল্পও বদলে দিচ্ছে বহু পরিবারের ছবি। বিশেষত মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির মাধ্যমে হরিণঘাটা ব্ল্যাক (Haringhata Black) প্রজাতির মুরগি পালন গ্রামাঞ্চলে আয়ের পাশাপাশি পরিবারের ডিম ও মাংস খাওয়ার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহুরে মধ্যবিত্ত থেকে গ্রামীণ পরিবার, সব স্তরেই ডিম এখন সবচেয়ে সহজলভ্য ও কম খরচের আমিষ প্রোটিনের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শুধু উৎপাদন বাড়লেই পুষ্টির ঘাটতি মিটবে না, প্রয়োজন সচেতনতার প্রচার এবং সাশ্রয়ী মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা।