Explainer: ভোটার তালিকার রাশ তাঁরই হাতে? কমিশনের অন্দরেই তুমুল সংঘাত, কে এই ‘বিতর্কিত’ সীমা খান্না?

Who is Seema Khanna, tech chief of ECI (Image: X/@6ESinger157593)

দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা, ভোটার তালিকা। আর সেই তালিকা নিয়ন্ত্রণের সফটওয়্যার নিয়েই এখন উত্তাল নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) অন্দরমহল। অভিযোগ, ভোটার ডেটাবেসের নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ কেন্দ্রীভূত হয়ে যাচ্ছে কমিশনের প্রযুক্তি বিভাগের হাতে। আর সেই কারণেই বহু নির্বাচন নিবন্ধন আধিকারিকের (Electoral Registration Officer, ERO) হাত থেকে কার্যত ফসকে যাচ্ছে তাঁদের আইনি ক্ষমতা। বিতর্কের কেন্দ্রে কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান, ডিরেক্টর জেনারেল (আইটি) সীমা খান্না (Seema Khanna)। অন্তত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট তেমনই বলছে। সেই দাবির সমর্থন মিলছে আরও বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমের তদন্ত রিপোর্টেও।

ইসিনেট আসলে কী

গত ২২ জানুয়ারি চালু হয় কমিশনের নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইসিনেট (ECINet)। একটি মাত্র মঞ্চে জুড়ে দেওয়া হয় কমিশনের চল্লিশটিরও বেশি পুরনো অ্যাপ ও পোর্টাল। উদ্দেশ্য ছিল ভোটার, রাজনৈতিক দল আর নির্বাচনী আধিকারিক, সকলের জন্য একটাই সহজ মঞ্চ তৈরি করা। চালুর সময়ে সীমা খান্না নিজেই দাবি করেছিলেন, এই সংহত ব্যবস্থা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আর আস্থা বাড়াবে। কিন্তু মাস কয়েকের মধ্যেই সেই দাবির উল্টো ছবি সামনে এল রিপোর্টে।


এত বিতর্ক কেন

কমিশনের দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সান্ধু (Sukhbir Singh Sandhu) ও বিবেক জোশী (Vivek Joshi) আলাদা আলাদা ভাবে প্রশ্ন তুলেছেন এই কেন্দ্রীকরণ নিয়ে। তাঁদের বক্তব্য, জেলা নির্বাচন আধিকারিক থেকে শুরু করে ইআরও পর্যন্ত সকলের ডেটাবেস অ্যাক্সেস ক্রমশ সীমিত করে দেওয়া হচ্ছে। অথচ জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০ (Representation of the People Act, 1950) এবং নির্বাচক নিবন্ধন বিধি, ১৯৬০ (Registration of Electors Rules, 1960) অনুযায়ী ভোটার তালিকায় নাম যোগ, বাদ বা সংশোধনের বৈধ ক্ষমতা রয়েছে ইআরওদের হাতেই। প্রশ্ন উঠেছে, একজন আইটি আধিকারিক কীভাবে সেই সাংবিধানিক ক্ষমতায় হাত দিতে পারেন।

গোয়ার ঘটনাই যেন প্রমাণ

অভিযোগের সপক্ষে সবচেয়ে জোরালো উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে গোয়ার ঘটনা। সেখানে ইআরও-রা ৯৭ জন ভোটারের নাম তালিকায় তোলার অনুমোদন দিলেও, ডেটাবেস অ্যাক্সেসের সমস্যায় শেষ পর্যন্ত সেই নামগুলি চূড়ান্ত তালিকায় ঢোকেইনি। জানা গিয়েছে, উপ নির্বাচন কমিশনার সঞ্জয় কুমার (Sanjay Kumar) গত বছরের ৪ নভেম্বর এবং তার পরে ২ জানুয়ারি, দুই দফায় চিঠি লিখে সীমা খান্নাকে অনুরোধ করেছিলেন, যাতে আইটি ব্যবস্থা ইআরওদের আইনি ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ না করে। অভিযোগ, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেই সুবিধা চালুই করা হয়নি। আর তার ফলেই বাদ পড়ে যান ওই ৯৭ জন ভোটার।

কে এই সীমা খান্না

সীমা খান্না জাতীয় ইনফরম্যাটিক্স কেন্দ্র (National Informatics Centre, NIC) থেকে বিশেষ দায়িত্ব নিয়ে ডেপুটেশন বা প্রতিনিয়োগে (deputation) কমিশনে যোগ দেন ২০২৫ সালে। এর আগে ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকে (MeitY) কর্মরত থাকাকালীন তিনি ছিলেন আরোগ্য সেতু (Aarogya Setu) অ্যাপ তৈরির দেলর অন্যতম সদস্য। যে অ্যাপ করোনাকালে বিশ্বের দ্রুততম ডাউনলোড হওয়া অ্যাপগুলির অন্যতম হয়ে উঠেছিল। এখন নির্বাচন কমিশনের প্রযুক্তি পরিকাঠামোর গোটা দায়িত্বই তাঁর কাঁধে। এই একই বিতর্কে নাম জড়িয়েছে সিনিয়র উপ নির্বাচন কমিশনার মণীশ গর্গের (Maneesh Garg) নামও, যাঁর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন দুই কমিশনার।

আরও পড়ুন: সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে অপসারণে ফের নোটিসের প্রস্তুতি, ১৪ আপত্তি ঘিরে তুঙ্গে বিতর্ক

আগেই বলেছিল তৃণমূল

এই বিতর্ক নতুন করে সামনে এলেও, সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়ে এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রশ্ন তোলে তৃণমূল কংগ্রেস। চলতি বছরের এপ্রিলে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে ঐতিহাসিক জয় পায় বিজেপি, অবসান ঘটে তৃণমূলের পনেরো বছরের শাসনের। হারের কারণের জন্য বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর নিয়ে সরব হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্লেখ্য, সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়ে সবার আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন অভিষেকই। পরে সুপ্রিম কোর্টে স্বয়ং হাজির হয়ে মমতা দাবি করেন, এসআইআরের নামে বাংলায় বেআইনি ভাবে বহু ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কমিশন নিজেই সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছে, এসআইআরে বাংলায় প্রায় ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যার মধ্যে ২২ লক্ষেরও বেশি ভোটার নিজের নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন: ‘জ্ঞানেশ কুমার দেশদ্রোহী’, রাজধানী থেকে তুমুল আক্রমণ শানালেন বিরোধী দলনেতা

মমতার অভিযোগ, ভোটগণনার প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম মেধা বা এআই (Artificial Intelligence) ব্যবহার করা হয়েছে এবং কারচুপি করায় গোটা গণনা প্রক্রিয়াই বিজেপির পক্ষে চলে গিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার (Gyanesh Kumar), উপ নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ ভারতী এবং সীমা খান্নার গ্রেপ্তারির দাবিও তোলেন তিনি। বিজেপি, জ্ঞানেশ কুমার আর সীমা খান্নাকে এক ব্র্যাকেটে বসিয়েই তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ওঁরা একটা প্রাইভেট কোম্পানি চালাচ্ছেন। অন্যদিকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, আদালতের নজরদারিতে এই গোটা বিষয়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে দুই নির্বাচন কমিশনারের সাম্প্রতিক আপত্তি তৃণমূলের পুরনো অভিযোগকেই যেন নতুন করে অক্সিজেন জুগিয়েছে। মমতার বক্তব্য, সান্ধু ও জোশীর উদ্বেগ আসলে তাঁদের আগের অভিযোগকেই সমর্থন করছে।

বিতর্কের নেপথ্যে বড় রাজনীতি

এই বিতর্ক নিছক প্রযুক্তিগত নয়। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-কে (Special Intensive Revision, SIR) ঘিরে ইতিমধ্যেই বিরোধীদের তোপের মুখে কমিশন। বিহারে এসআইআরে প্রায় ৬৮ লক্ষ নাম বাদ পড়া নিয়ে আগেই অভিযোগ তুলেছিল বিরোধী শিবির। দাবি ছিল গরিব, পরিযায়ী আর সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম টার্গেট করে বাদ দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বিতর্ক হয়, বাংলায়। এবার কমিশনের অন্দরের এই টানাপড়েন এবং বিতর্ক ফাঁস হওয়ায় স্বভাবতই উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজনীতি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ব্যাখ্যা, নির্বাচনী তথ্যপ্রযুক্তির রাশ যদি হাতে গোনা কয়েকজন আমলার কুক্ষিগত হয়ে যায়, তাহলে গোটা প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। এবং এর জল বহুদূর গড়াবে। কমিশনের পাশাপাশি আগামীতে কৈফিয়ত দিতে হবে সীমা খান্নাকেও।