দেশের স্কুল-কলেজে যৌন শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে এবার বড়সড় মোড়। সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) কেন্দ্র জানিয়ে দিল, এখন থেকে দেশজুড়ে বয়স-উপযোগী ব্যাপক যৌন শিক্ষা (Comprehensive Sex Education) চালু করতে সরকার প্রস্তুত। শীর্ষ আদালতের অনুমোদন মিললেই তা কার্যকর হবে বলে সোমবার আদালতে জানিয়েছে কেন্দ্র। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে ইতিমধ্যেই শিক্ষামহল ও অভিভাবকদের মধ্যে জোরদার আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে।
ঠিক কী নিয়ে মামলা
কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সম্মতিসাপেক্ষ সম্পর্ক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের গর্ভাবস্থার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলি পকসো আইনে (Protection of Children from Sexual Offences বা POCSO Act) ঠিক কীভাবে বিচার করা হবে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন তুলছিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল, এই ধরনের সমস্ত ঘটনাকে যান্ত্রিকভাবে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত না করে শিশু সুরক্ষা ও কিশোর-কিশোরীদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা প্রয়োজন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
২৬ সদস্যের কমিটির সুপারিশ
সরকার এই কাজের জন্য মহিলা ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রকের (Ministry of Women and Child Development) এক অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে ২৬ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল। ওই কমিটিতে ছিলেন টাটা ইনস্টিটিউট অফ সোশ্যাল সায়েন্সেসের (TISS) প্রতিনিধি, ক্লিনিকাল সাইকোলজিস্ট, বিভিন্ন মন্ত্রক ও রাজ্য সরকারের আধিকারিক, জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগ (NCPCR) এবং জাতীয় আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের (NALSA) সদস্যরাও। কমিটির মূল সুপারিশ হল, ব্যাপক যৌন শিক্ষা ও শিশু নিগ্রহ সচেতনতাকে (Child Sexual Abuse Awareness) মূল পাঠ্যক্রমের অংশ করে তোলা হোক। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র (National Education Policy বা NEP 2020) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এনসিইআরটি (NCERT) গোটা পাঠ্যক্রম নতুন করে ঢেলে সাজাক, এমনটাও সুপারিশ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ফের অগ্নিমূল্য ডলার: ৯৬ পার করে তলানিতে টাকা, বাড়তি চাপে কলকাতাও
পড়ুয়াদের ঠিক কী পড়ানো হতে পারে
প্রস্তাবিত পাঠ্যক্রমে থাকছে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, শরীর সম্পর্কে সচেতনতা, ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ (Good Touch Bad Touch), ব্যক্তিগত সুরক্ষা, বয়ঃসন্ধি, সম্মতি বা কনসেন্ট (Consent), সুস্থ সম্পর্ক এবং প্রজনন স্বাস্থ্যের মতো বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বয়স অনুযায়ী ধাপে ধাপে এই পাঠ সাজানোর কথা বলা হয়েছে, যাতে শিশুশ্রেণি থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত পড়ুয়ারা নিজেদের বয়স ও মানসিক পরিপক্কতা অনুযায়ী তথ্য পায়।
স্কুল ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া কী
একাধিক স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, প্রাক-প্রাথমিক স্তর থেকেই তাঁরা ইতিমধ্যে ভালো স্পর্শ, খারাপ স্পর্শ ও পকসো সচেতনতা নিয়ে সেশন চালান। এই উদ্যোগ পাঠ্যক্রমের আনুষ্ঠানিক অংশ হয়ে গেলে তা দেশজুড়ে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরি করবে বলেই মনে করছেন তাঁরা। তবে একইসঙ্গে সতর্কও করেছেন অনেকে, শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ, বয়স-উপযোগী পাঠ্যসামগ্রী এবং অভিভাবকদের আস্থায় নেওয়া ছাড়া এই উদ্যোগ সফল হবে না। সমাজ ও মনোবিদদের একাংশের মতে, শুধু ক্লাসরুমের পাঠে সীমাবদ্ধ না থেকে বাড়িতেও অভিভাবকদের এই আলোচনায় সমান ভূমিকা নিতে হবে, নইলে শিশুরা ভুল তথ্যের জন্য বন্ধু বা সমাজমাধ্যমের উপরেই নির্ভর করবে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই প্রস্তাব পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আসাম, মহারাষ্ট্র ও পশ্চিমবঙ্গের পকসো মামলা নিয়ে করা একটি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, রোমান্টিক সম্পর্ক সংক্রান্ত মামলাগুলির মধ্যে প্রায় ৮৮ শতাংশ ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগী মেয়েটি নিজেই অভিযুক্তের সঙ্গে সম্মতিসাপেক্ষ সম্পর্কের কথা স্বীকার করেছিলেন আর প্রায় ৯৪ শতাংশ ক্ষেত্রেই মামলা শেষমেশ খারিজ হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয়, সচেতনতার অভাবে কীভাবে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ছেন রাজ্যের বহু কিশোর-কিশোরী। এই নতুন জাতীয় পাঠ্যক্রম বাস্তবায়িত হলে তা নানা জনমুখী প্রকল্পের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে রাজ্যের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা আরও বাড়াতে পারে বলেই মত শিক্ষাবিদদের একাংশের। তবে পশ্চিমবঙ্গের স্কুলশিক্ষা মূলত রাজ্য বোর্ড তথা মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের (WBBSE) নিজস্ব পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে, তাই এনসিইআরটি-র সংশোধিত কাঠামো রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলিতে ঠিক কীভাবে ও কতটা প্রযোজ্য হবে, তা নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনও মেলেনি।
এরপর কী
আপাতত গোটা বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায়। আদালত সবুজ সংকেত দিলে দেশজুড়ে স্কুল ও কলেজে একটি সমন্বিত পাঠ্যক্রম কার্যকর হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। তবে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের একাংশের বক্তব্য, শুধু নীতি চালু করলেই হবে না, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অভিভাবকদের সচেতনতা এবং প্রতিটি বয়সের উপযোগী পাঠদান পদ্ধতিতে সমান জোর দিতে হবে, তবেই এই উদ্যোগ প্রকৃত অর্থে সফল হবে।