বিহারের পাটনা লাগোয়া বাঁকিপুর (Bankipur) বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচন নিয়ে হঠাৎ করেই সরগরম গোটা দেশের রাজনীতি। কারণ একটাই, এই লড়াইয়ে সরাসরি প্রার্থী হয়ে নেমে পড়েছেন ভোট-কুশলী থেকে রাজনীতিক হয়ে ওঠা প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor)। তাঁর দল জন সুরজ (Jan Suraaj) পার্টির কাছে এই ভোট স্রেফ একটা আসনের লড়াই নয়, বরং অস্তিত্বের প্রশ্ন।
কেন উপনির্বাচন
বাঁকিপুর এতদিন ছিল বিজেপির (BJP) অভেদ্য দুর্গ। ১৯৯৫ সাল থেকে এই আসনে কখনও হারেনি গেরুয়া শিবির। দীর্ঘদিন এই কেন্দ্রের বিধায়ক ছিলেন নীতিন নবীন। সম্প্রতি তিনি বিজেপির রাজ্য সভাপতি হওয়ার পাশাপাশি রাজ্যসভায় (Rajya Sabha) চলে যাওয়ায় আসনটি ফাঁকা হয়। আর সেই ফাঁকা আসনেই এবার সরাসরি ময়দানে প্রশান্ত কিশোর।
বিজেপি টিকিট দিয়েছে যুব মোর্চার নেতা নীরজ কুমার সিনহাকে। অন্যদিকে আরজেডি (RJD) ফের প্রার্থী করেছে রেখা গুপ্তাকে, যিনি গতবার নীতিন নবীনের কাছে প্রায় ৫০ হাজার ভোটে হেরেছিলেন। মোট ২৫ থেকে ২৬ জন প্রার্থী থাকলেও লড়াই মূলত ত্রিমুখী।
ভোট খুবই কম পড়েছে
গত ৩০ জুলাই ভোট হয়েছে বাঁকিপুরে। নির্বাচন কমিশনের হিসেবে ভোট পড়েছে মাত্র ৩৪.২৪ শতাংশ, যা গতবারের বিধানসভা ভোটের তুলনায় প্রায় সাত শতাংশ কম। কম ভোট নিয়েই শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, কম ভোট পড়া মানেই শহুরে, মধ্যবিত্ত ভোটারের ঢিলেমি, যা চিরাচরিত ভাবে গেরুয়া শিবিরের পক্ষে যায়। আবার অন্য অংশের মত, তরুণ ভোটারের অনীহাই আসলে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে নীরব ক্ষোভের ইঙ্গিত।
জেন জি ফ্যাক্টর
এবারের ভোটে একটা বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে নিট-ইউজি (NEET-UG) প্রশ্নফাঁস ঘিরে দেশজোড়া ছাত্র আন্দোলন। বিহারেও এই আন্দোলনের আঁচ পড়েছিল, পাটনায় বিক্ষোভ কিছুটা হিংসাত্মক চেহারাও নিয়েছিল। সিওয়ানে আন্দোলনকারীদের উপর গুলিও চলে বলে দাবি। সামগ্রিক ভাবে তরুণ প্রজন্মের বিরাট ক্ষোভ এখন শাসকশিবিরের বিরুদ্ধে। ফলে এই প্রেক্ষিতে এটাই বিজেপির প্রথম বড় নির্বাচনী পরীক্ষা বলে ধরা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, তরুণ প্রজন্মের এই ক্ষোভ আদৌ ইভিএমে প্রতিফলিত হবে, নাকি নিছকই আলোচনার বিষয় হয়ে থেকে যাবে, সেটাই দেখার।
প্রশান্ত কিশোরের পরীক্ষা
২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা ভোটে জন সুরজের অভিষেক মোটেও ভাল হয়নি। এনডিএ ২০০-র বেশি আসন জিতে সরকার গড়ে, প্রশান্ত কিশোরের দল খাতাই খুলতে পারেনি। তার পরে এই প্রথম নিজে প্রার্থী হয়ে সরাসরি লড়াইয়ে নেমেছেন তিনি। ফলে বাঁকিপুরের ফল তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রথম বড় পরীক্ষা।
এখানেই উঠে আসছে একটা আলাদা প্রসঙ্গ, যা পশ্চিমবঙ্গের পাঠকের কাছে বিশেষ ভাবে প্রাসঙ্গিক। ২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে ভোট কুশলী হিসেবে কাজ করেছিল প্রশান্ত কিশোরের সংস্থা আই-প্যাক (I-PAC)। সেই ভোটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বড় জয়ের নেপথ্যে কৌশল সাজানোয় বড় ভূমিকা ছিল তাঁর টিমের। আজ সেই একই কৌশলী নিজে প্রার্থী হয়ে ভোটের ময়দানে, তাও আবার নিজের রাজ্যেই। বাংলার রাজনৈতিক মহলের কাছে তাই বাঁকিপুরের লড়াইয়ের একটা আলাদা কৌতূহলের জায়গা রয়েছে।
এক্সিট পোলে এগিয়ে কে
ভোট মেটার পরেই একাধিক বেসরকারি সমীক্ষা সংস্থা এক্সিট পোল প্রকাশ করেছে। বেশ কয়েকটি সমীক্ষায় প্রশান্ত কিশোরকে এগিয়ে রাখা হয়েছে, কোনওটিতে আবার ব্যবধান সামান্য। তবে মনে রাখা জরুরি, এক্সিট পোল কখনওই চূড়ান্ত ফলের নিশ্চয়তা দেয় না। বিহারেই অতীতে একাধিকবার এক্সিট পোলের অনুমান পুরোপুরি উলটে গিয়েছে বাস্তবের ফলে।
আসল ছবি
আগামী ৩ আগস্ট পটনার এএন কলেজে ভোট গণনা। সেদিনই স্পষ্ট হবে, তিন দশকের গেরুয়া দুর্গ অটুট থাকে, নাকি বিহারের রাজনীতিতে নতুন করে জায়গা করে নেয় প্রশান্ত কিশোরের দল। বা বলা ভালো পক্ষান্তরে, বাঁকিপুরই কি হয়ে দাঁড়াবে জেন জি-র বদলাপুর!