কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। সেই পরিস্থিতিতে ভারতও বড়সড় প্রস্তুতি শুরু করেছে। স্কুলশিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন— প্রায় সব ক্ষেত্রেই এআই শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের এই পরিকল্পনা শুধু উচ্চাভিলাষীই নয়, বরং বিশ্বের বৃহৎ সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাগুলির মধ্যে অন্যতম বিস্তৃত উদ্যোগ বলেও ধরা হচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদের আওতায় থাকা ৩২ হাজারেরও বেশি স্কুলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গণনাভিত্তিক চিন্তাভাবনার পাঠ্যক্রম চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ‘স্বয়ম’, ‘ফিউচারস্কিলস প্রাইম’ এবং ‘ইন্ডিয়াএআই মিশন’-এর মতো জাতীয় স্তরের কর্মসূচিও প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা গড়ে তুলতে বড় ভূমিকা নিচ্ছে। ফলে স্কুলস্তর থেকে শুরু করে চাকরিক্ষেত্র পর্যন্ত একটি সমন্বিত এআই পরিকাঠামো তৈরির চেষ্টা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, ভারতের এই উদ্যোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর বিস্তৃতি। শুধুমাত্র শহুরে অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সীমাবদ্ধ না রেখে সরকারি এবং বেসরকারি— উভয় ধরনের স্কুলেই এআই শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় সংখ্যক দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই পরিকল্পনা এখনও সমস্যার একদিককেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত দক্ষতা শেখালেই হবে না, সেই সঙ্গে সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, নৈতিকতা, তথ্যের নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির সামাজিক প্রভাব সম্পর্কেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনছে না, কর্মসংস্থান, সমাজ এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও বড় প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে বহু স্কুলেই এআই শিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত শিক্ষক, আধুনিক কম্পিউটার এবং নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট পরিষেবার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ এবং পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে এই সমস্যা আরও প্রকট। ফলে পাঠ্যক্রম চালু হলেও বাস্তবে সব পড়ুয়ার কাছে সমানভাবে এই শিক্ষা পৌঁছবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শিক্ষা শুধু প্রোগ্রামিং শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। পড়ুয়াদের এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে যাতে তারা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারে। সেই সঙ্গে এআই ব্যবহারের ঝুঁকি, ভুয়ো তথ্যের বিস্তার এবং ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার মতো বিষয়েও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
‘স্বয়ম’ এবং ‘ফিউচারস্কিলস প্রাইম’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষাকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে ‘ইন্ডিয়াএআই মিশন’-এর লক্ষ্য দেশের নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিকাঠামো এবং গবেষণাকে শক্তিশালী করা। কেন্দ্রের দাবি, আগামী কয়েক বছরে এই প্রকল্পগুলি দেশের প্রযুক্তিখাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে এআই শিক্ষার এই পরিকল্পনা সফল হলে তা শুধু দেশের প্রযুক্তি শিল্পকেই এগিয়ে দেবে না, বরং বৈশ্বিক ক্ষেত্রেও ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে সেই সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত বৈষম্য কতটা কমানো যায় তার উপর।