বেকারত্ব ও যুব অসন্তোষ

দিল্লির রাজপথে ছাত্র-যুবদের প্রতিবাদ হোক বা ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে চাকরিপ্রার্থীদের টানা আন্দোলন— এগুলিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমছে, তার পিছনে রয়েছে একটি গভীর সমস্যা– শিক্ষার পরেও উপযুক্ত কাজের নিশ্চয়তা নেই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ। ফলে চাকরির আশাটুকুও যখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন ক্ষোভ রাস্তায় নামবেই।
ঝাড়খণ্ডের ঘটনা তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। রাঁচিতে কয়েক সপ্তাহ ধরে ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীরা আন্দোলন করছেন। অনেকে অনশনেও বসেছেন। রাজ্য সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগে কারচুপির অভিযোগ ঘিরে পরীক্ষা বাতিল এবং সিবিআই তদন্তের দাবি উঠেছে। তদন্তের পথে এগিয়েছে রাজ্য সরকার, গ্রেফতারও হয়েছে বেশ কয়েক জন। কিন্তু সমস্যাটিকে কেবল একটি পরীক্ষার অনিয়ম হিসেবে দেখলে মূল বিষয়টি আড়ালেই থেকে যাবে।
ঝাড়খণ্ড আলাদা কোনও ব্যতিক্রম নয়। রাজ্যটি গঠিত হওয়ার প্রায় সিকি শতক পেরিয়েও তার বিপুল খনিজ সম্পদ সাধারণ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। শিল্পের সুযোগ কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। ফলে বহু মানুষ কাজের সন্ধানে অন্য রাজ্যে পাড়ি দেন। এর মধ্যে সরকারি চাকরির আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। কিন্তু সেই চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়াই যদি বছরের পর বছর অনিয়ম, মামলা এবং বিতর্কে আটকে থাকে, তবে তরুণদের হতাশা আরও তীব্র হওয়া স্বাভাবিক।
ঝাড়খণ্ডে সরকারি নিয়োগের ইতিহাসও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। এক সময়ে দীর্ঘদিন সিভিল সার্ভিস পরীক্ষা হয়নি। পরে জমে থাকা নিয়োগের ঘাটতি মেটাতে একসঙ্গে একাধিক পরীক্ষা নেওয়া হলেও সেগুলির স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু পরীক্ষার দিন বা প্রশ্নপত্রে নয়, গোটা নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এই সংকটের ব্যাপ্তি আরও বড়। কয়েক বছর আগে উত্তরপ্রদেশে কয়েক হাজার কনস্টেবল পদের জন্য বিপুল সংখ্যক প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছিল। কর্ণাটকেও বিপুল সরকারি শূন্যপদে নিয়োগের দাবিতে তরুণদের আন্দোলন হয়েছে। অর্থাৎ সরকারি চাকরির বাজারে চাহিদা কতটা বেশি এবং সরবরাহ কতটা কম, এই ঘটনাগুলিই তার প্রমাণ।
ভারতে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক তরুণ স্নাতক হচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষিত যুবকদের বড় অংশই দ্রুত স্থায়ী ও সম্মানজনক কাজ পাচ্ছেন না। অনেকের সামনে তখন দু’টি পথ— কম মাইনের অনিশ্চিত কাজ অথবা সরকারি চাকরির জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি। উচ্চশিক্ষার খরচ বাড়ছে, অথচ তার বিনিময়ে নিশ্চিত কর্মসংস্থান মিলছে না। এই ব্যবধানই হতাশার অন্যতম উৎস।
এদিকে দেশে বহু সরকারি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে রয়েছে। শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসনিক কর্মীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় লোকবল না থাকায় একদিকে পরিষেবার মান কমছে, অন্যদিকে চাকরির সুযোগও তৈরি হচ্ছে না। অর্থ সাশ্রয়ের যুক্তিতে শূন্যপদ ফাঁকা রাখা স্বল্পমেয়াদে সুবিধাজনক মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্য দিতে হয় সমাজকেই।
তবে সমস্যার সমাধান শুধু সরকারি চাকরিতে সব শূন্যপদ পূরণ করলেই হবে না। বেসরকারি ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করাও জরুরি। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, শিল্পের পরিকাঠামো উন্নত করতে হবে, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগকে শক্তিশালী করতে হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে কর্মমুখী করতে হবে। ঝাড়খণ্ডের মতো রাজ্যে প্রাকৃতিক সম্পদের সুফল স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হলে দক্ষতা উন্নয়ন ও শিল্পায়নকে একইসঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।
সবচেয়ে জরুরি, নিয়োগ পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা। প্রশ্নপত্র ফাঁস, ফল প্রকাশে অস্বচ্ছতা বা নিয়োগে পক্ষপাতের অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সরকারি চাকরি সীমিত হতে পারে, কিন্তু সেই সীমিত সুযোগটুকুও যদি ঠিকভাবে বণ্টিত না হয়, তাহলে তরুণদের আস্থাই নষ্ট হয়।
তাই সরকারের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দেশের একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নতুন করে আস্থা তৈরি করা। বিনামূল্যের সুবিধা দিয়ে সাময়িক রাজনৈতিক লাভ হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়। তরুণদের হাতে অনুদান নয়, দরকার শিক্ষা, দক্ষতা এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজের সুযোগ। তাই যুব অসন্তোষকে দমন নয়, তার কারণ দূর করাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।