বিশ্বকাপের শিক্ষা, কেমন শিখল বিশ্ব?

World Cup Photo-SNS

বিশ্বকাপ ফুটবল শেষের পথে। আগামীকাল ফাইনাল— মুখোমুখি স্পেন ও আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচ ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে, কারণ এটি শুধু দুই শক্তিশালী দলের লড়াই নয়, বরং দুই ভিন্ন ফুটবল দর্শনের সংঘর্ষ। একদিকে স্পেনের শক্তিশালী রক্ষণ ও শৃঙ্খলিত খেলা, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগের সৃজনশীলতা ও ধার। আর এর মাঝখানে রয়েছে এক প্রতীকী মুহূর্ত— লিওনেল মেসি ও তরুণ লামিন ইয়ামালের মুখোমুখি হওয়া। প্রায় দুই দশক আগে বাথটাবে শিশু ইয়ামালকে নিয়ে তরুণ মেসিকে এক ছবিতে দেখা গিয়েছিল, আজ তাঁরা একই মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বী।
তবে এই বিশ্বকাপকে শুধু ফাইনালের ফলাফল দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। ২০২৬ সালের এই আসর ফুটবলের অনেক বড় প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে। প্রথমত, দলসংখ্যা ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরুতে অনেক বিতর্ক ছিল। অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এতে প্রতিযোগিতার মান কমে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল উল্টো চিত্র। এশিয়া ও আফ্রিকার দলগুলির অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং জাপান, সেনেগাল, মিশর বা কেপ ভার্দের মতো দলগুলি দারুণ লড়াই করে প্রমাণ করেছে যে ফুটবল আর কেবল কয়েকটি দেশের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়। এই বিস্তার ফুটবলকে আরও গণতান্ত্রিক করেছে।
তবে প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক কমেনি, বরং বেড়েছে। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর), সেন্সরযুক্ত বল, আধা-স্বয়ংক্রিয় অফসাইড প্রযুক্তি— এসবের উদ্দেশ্য ছিল খেলার সিদ্ধান্তকে আরও নিখুঁত করা। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রযুক্তি নতুন ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করছে। একেকটি সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় লাগছে, দর্শকদের উত্তেজনা কমে যাচ্ছে, আর অনেক সময় সিদ্ধান্তের যুক্তি স্পষ্ট নয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে— ফুটবলে প্রযুক্তি কতটা থাকা উচিত? প্রযুক্তি কি খেলাকে সাহায্য করছে, নাকি তার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করছে?
বিশ্বকাপ মানেই শুধু মাঠের খেলা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজের নানা বিষয়। এবারের আসরও তার ব্যতিক্রম নয়। অভিবাসন নীতি, টিকিট বিক্রির সমস্যা, কিছু দেশের দলের প্রতি আচরণ—সব মিলিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ সবসময়ই একটি রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৩৪ সালের ইতালি হোক বা ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা— প্রতিটি সময়েই শাসকরা এই মঞ্চকে নিজেদের শক্তি ও মর্যাদা প্রদর্শনের জন্য ব্যবহার করেছেন। আজও সেই প্রবণতা পুরোপুরি বদলায়নি।
খেলোয়াড়রাও এই বাস্তবতা থেকে আলাদা নন। মাঠের বাইরে তাঁদের অবস্থান ও বক্তব্য অনেক সময় বড় বিতর্কের জন্ম দেয়। সাম্প্রতিক ঘটনায় দেখা গিয়েছে, একটি দলের খেলোয়াড়রা একটি রাজনৈতিক দাবিকে সমর্থন জানিয়ে ব্যানার প্রদর্শন করেছেন, যা নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। এতে বোঝা যায়, ফুটবল শুধু খেলা নয়— এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ।
তবুও, এত বিতর্কের মাঝেও বিশ্বকাপ তার আসল সৌন্দর্য হারায়নি। শেষ মুহূর্তের গোল, অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, ছোট দলের বড় সাফল্য— এই সবই ফুটবলকে আবারও সুন্দর খেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দর্শকরা আবারও অনুভব করেছেন, কেন ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা।
ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনার লড়াই তাই শুধু একটি ম্যাচ নয়, এটি এই পুরো যাত্রার চূড়ান্ত পরিণতি। এখানে জয়-পরাজয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই বিশ্বকাপের শিক্ষা। ফুটবল আজ আরও বিস্তৃত, আরও জটিল এবং আরও প্রভাবশালী। প্রযুক্তি, রাজনীতি ও বিশ্বায়নের মাঝেও খেলার মূল আকর্ষণ এখনও অটুট।

শেষ পর্যন্ত, ট্রফি যে-ই জিতুক, ২০২৬ বিশ্বকাপ মনে থাকবে তার বৈচিত্র্য, নাটকীয়তা এবং প্রশ্ন তোলার সাহসের জন্য। ফুটবল আমাদের শুধু আনন্দ দেয় না, আমাদের ভাবতেও শেখায়। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপ প্রতি চার বছরে একবার এসে আমাদের নতুন করে একত্রিত করে— ভাষা, দেশ বা সংস্কৃতির সীমা ছাড়িয়ে।