ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন

প্রতীকী চিত্র

দিল্লি-এনসিআরে একের পর এক নাবালিকা ও মহিলার উপর যৌন নির্যাতনের ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের স্বতঃপ্রণোদিত হস্তক্ষেপ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। আদালত দিল্লি পুলিশকে অবিলম্বে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলি চিহ্নিত করা, টহলদারি বাড়ানো এবং পার্ক ও অন্যান্য জনপরিসরে আলো ও সিসিটিভি ব্যবস্থার অডিট করার নির্দেশ দিয়েছে। চার সপ্তাহের মধ্যে এই কাজ শেষ করার কথাও বলা হয়েছে।
কিন্তু আদালতের নির্দেশের গুরুত্ব শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— দেশের রাজধানীর মতো একটি শহরে একজন মহিলা বা কিশোরী কি আজও নিশ্চিন্তে রাস্তায়, পার্কে, বাসে কিংবা মেট্রো স্টেশনে চলাফেরা করতে পারেন?
সম্প্রতি দিল্লিতে ১৭ বছরের এক কিশোরীর উপর নির্যাতন, স্বরূপনগরে নাবালিকার গণধর্ষণ এবং গ্রেটার নয়ডা থেকে দিল্লিগামী বাসে এক নাবালিকার উপর যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, নিরাপত্তার ব্যবস্থায় কোথায় কোথায় বড় ফাঁক রয়েছে। বিশেষ করে চলন্ত বাসে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পরও কোনও পুলিশ পিকেটে সেটি না থামার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১২ সালের নির্ভয়া-কাণ্ডের পর বহু বছর কেটে গেলেও যদি একই ধরনের প্রশ্ন ফিরে আসে, তবে শুধু আইন তৈরি করলেই যে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, তা স্পষ্ট।
সুপ্রিম কোর্ট ঠিকই বলেছে, জনপরিসর কোনোভাবেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হয়ে উঠতে পারে না। আলো কম, সিসিটিভি অকেজো, পুলিশি টহল দুর্বল— এই সব প্রশাসনিক ত্রুটি অপরাধের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। তাই জেলা ধরে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানচিত্র তৈরি, থানাগুলির মধ্যে তথ্যের আদানপ্রদান, সন্ধ্যা ও ভোরের সময় অতিরিক্ত টহল এবং অকেজো আলো ও ক্যামেরা দ্রুত মেরামত করার নির্দেশ বাস্তবায়িত হওয়া জরুরি।
তবে এখানেই সমস্যার শেষ নয়। শুধু পুলিশি নজরদারি বাড়িয়ে মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর সঙ্গে জড়িত সমাজের মানসিকতাও। বহু ক্ষেত্রেই এখনও মেয়েদের পোশাক, চলাফেরা, রাত করে বাড়ি ফেরা বা পুরুষ বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়। অর্থাৎ অপরাধীর আচরণের পরিবর্তে প্রশ্ন চলে যায় আক্রান্ত মেয়েটির আচরণের দিকে। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অন্যায় নয়, বিপজ্জনকও। কারণ এতে অপরাধীর দায় আড়ালে চলে যায় এবং ভুক্তভোগীর উপরই সামাজিক চাপ তৈরি হয়।
মেয়েদের নিরাপত্তা মানে তাঁদের চলাফেরার স্বাধীনতা কমিয়ে দেওয়া নয়। বরং এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে একজন মেয়ে রাতেও প্রয়োজনে রাস্তায় বেরোতে পারবেন, গণপরিবহনে উঠতে পারবেন, পার্কে যেতে পারবেন এবং তাঁর নিরাপত্তার জন্য তাঁকেই অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে না। পরিবারেও ছেলেমেয়েদের ছোটবেলা থেকে সম্মান, সম্মতি এবং ব্যক্তিগত সীমারেখার শিক্ষা দেওয়া জরুরি। যৌন হেনস্থাকে ‘মেয়েদের ব্যাপার’ বলে না দেখে সামাজিক অপরাধ হিসেবে দেখা দরকার।
প্রশাসনের দায় অবশ্যই সবচেয়ে বেশি। কিন্তু দায় শুধু পুলিশের নয়— পুরসভা, পরিবহন কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকেও তার অংশ নিতে হবে। সুপ্রিম কোর্ট যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং ‘জবাবদিহি’র কথা বলেছে, সেটিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও ঘটনার পরে সমবেদনা জানানো যথেষ্ট নয়, আগে থেকেই ঝুঁকি চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
নিরাপদ শহর কেবল বেশি পুলিশ বা বেশি ক্যামেরায় তৈরি হয় না। তৈরি হয় কার্যকর প্রশাসন, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং নারীকে সমান নাগরিক হিসেবে দেখার মানসিকতা দিয়ে। দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি তাই শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়, এগুলি আমাদের সমাজের কাছেও একটি কঠিন আত্মসমীক্ষার দাবি জানায়।