মোদীর শান্তির ডাকে পুতিন কি যুদ্ধবন্ধ করবেন?

Image: IANS

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান চেয়ে ফের সরব হলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের সময় তিনি বললেন, যুদ্ধ যত দিন চলে, মানবসভ্যতা তত পিছিয়ে যায়। অন্যদিকে শান্তির পথে এগোনোর প্রতিটি পদক্ষেপ মানুষের মনে নতুন আশা তৈরি করে। কথাগুলি নিঃসন্দেহে শান্তির পক্ষে। কিন্তু প্রশ্ন হল, মোদীর এই আবেদন কি পুতিনের যুদ্ধের সিদ্ধান্তে কোনও পরিবর্তন আনতে পারবে? নাকি এটিও কূটনীতির পরিচিত ভাষায় বলা একটি বার্তা হিসেবেই থেকে যাবে?

বাস্তবতা হল, ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারতের অবস্থানে নতুন কোনও নাটকীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই দিল্লি একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে, অন্যদিকে যুদ্ধের বিরোধিতা করে বারবার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলেছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ২০২২ সালেই পুতিনকে প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘এখন যুদ্ধের সময় নয়।’ তারপরও যুদ্ধ থামেনি। বরং চার বছরেরও বেশি সময় ধরে সংঘাত আরও জটিল হয়েছে।

তাহলে মোদি বারবার পুতিনকে যুদ্ধ বন্ধ করার কথা বলছেন কেন? এর উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই মনে রাখতে হবে, ভারতের বিদেশনীতি কোনও একটি শক্তির প্রতি আনুগত্যের উপর দাঁড়িয়ে নেই। স্বাধীনতার পর থেকেই ভারত নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। বর্তমান সময়ে এই নীতিকে বলা হয় ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’। অর্থাৎ আমেরিকা বা ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক যতই ঘনিষ্ঠ হোক, রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের পুরনো সম্পর্কও দিল্লি হঠাৎ ছিন্ন করতে চায় না।

রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগী। ভারতীয় সামরিক সরঞ্জামের একটি বড় অংশ এখনও রাশিয়ান উৎসের। শুধু প্রতিরক্ষা নয়, জ্বালানি ক্ষেত্রেও রাশিয়া ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা দেশগুলি রাশিয়ার উপর নানা নিষেধাজ্ঞা চাপালেও ভারত তুলনামূলক কম দামে রুশ তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ভারতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা— দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ।


অন্যদিকে ভারত একই সঙ্গে আমেরিকা, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোয়াডের সদস্য। ভারত আমেরিকা ও ইউরোপের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কৌশলগত সহযোগিতাও বাড়িয়েছে। ফলে দিল্লিকে একদিকে মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলির সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করতে হচ্ছে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই ভারতের কূটনীতির বড় পরীক্ষা।

এই অবস্থায় মোদীর শান্তির আহ্বানকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি ভারতের নিজস্ব কূটনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে। ভারত বলতে চাইছে— রাশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু যুদ্ধকে সমর্থন করা ভারতের নীতি নয়। আবার পশ্চিমা দেশগুলির চাপেও ভারত রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে না।

এই ভারসাম্যের নীতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভারতের গুরুত্বও বাড়িয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ভারত রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলির অবস্থান পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। আবার রাশিয়ার যুদ্ধনীতিকেও প্রকাশ্যে সমর্থন করেনি। বরং বারবার আলোচনা, কূটনীতি এবং শান্তির পথের কথা বলেছে।

কিন্তু এখানেই বড় প্রশ্ন—পুতিন কি ভারতের কথা শুনবেন? সম্ভাবনা খুব বেশি বলে মনে হয় না। কারণ ইউক্রেন নিয়ে রাশিয়ার হিসাব এখন অনেকটাই সামরিক বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল। মস্কোর ধারণা, যুদ্ধক্ষেত্রে সময় যত গড়াবে, ইউক্রেনের উপর চাপ তত বাড়বে। ইউক্রেনের সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি ক্ষয় হবে এবং শেষ পর্যন্ত কিয়েভকে রাশিয়ার শর্ত মেনে আলোচনায় বসতে হতে পারে। রাশিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক তৎপরতা অন্তত সেই ধারণারই ইঙ্গিত দেয়।

অন্যদিকে ইউক্রেনও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য পশ্চিমা দেশগুলির কাছ থেকে বিপুল সাহায্য পাচ্ছে। রাশিয়ার ভূখণ্ডের ভিতরেও ইউক্রেনের ড্রোন হামলা বেড়েছে। রুশ তেল শোধনাগার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধ এখন আর শুধু ইউক্রেনের মাটিতে সীমাবদ্ধ নেই, তার অভিঘাত রাশিয়ার অভ্যন্তরেও পৌঁছেছে।

এই পরিস্থিতিতে পুতিন কেন যুদ্ধ থামাবেন? তাঁর কাছে যদি মনে হয় সামরিক পথে আরও কিছু অর্জন করা সম্ভব, তাহলে হঠাৎ যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার উৎসাহ তাঁর থাকবে না। মোদীর বক্তব্যের জবাবে পুতিন যে ধরনের প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি মোদীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, তাঁরা সেই পথেই এগিয়ে চলেছেন। কথাটি শুনতে আশাব্যঞ্জক হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত অস্পষ্ট। কোন পথ? শান্তির পথ, না কি যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের পথ? কত দ্রুত সেই পথে এগোনো হবে? তার কোনও স্পষ্ট উত্তর নেই।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এই ধরনের ভাষার গুরুত্ব কম নয়। রাষ্ট্রনেতারা অনেক সময় এমন বক্তব্য রাখেন, যার মাধ্যমে কোনও প্রতিশ্রুতি না দিয়েও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা যায়। পুতিনের বক্তব্য সম্ভবত সেই ধরনেরই। তিনি মোদীর আবেদনের বিরোধিতা করেননি, কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ করার কোনও নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিও দেননি।

এখানে মোদীর অবস্থানেরও একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ভারত রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও রাশিয়ার উপর এমন চাপ সৃষ্টি করার মতো অবস্থানে নেই, যাতে পুতিন তাঁর যুদ্ধের কৌশল বদলাতে বাধ্য হন। বন্ধুত্ব এবং প্রভাব— দুটি এক জিনিস নয়। ভারত রাশিয়ার সঙ্গে কথা বলতে পারে, নিজের উদ্বেগ জানাতে পারে, শান্তির পক্ষে যুক্তি দিতে পারে, কিন্তু যুদ্ধ থামানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত মস্কোর নিজের রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাবের উপরই নির্ভর করবে।

তবে তার অর্থ এই নয় যে, মোদীর বক্তব্য অর্থহীন। বরং এই ধরনের বক্তব্য ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধের সময় কোনও দেশ যদি নীরব থাকে, তার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভারত সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইছে— আমরা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছি, কিন্তু যুদ্ধ চাই না। আমরা কোনও শিবিরের অন্ধ অনুসারী নই, আমরা শান্তি ও আলোচনার পক্ষে।

পশ্চিমা দেশগুলির কেউ কেউ হয়তো মনে করবেন, মোদীর আরও কঠোর ভাষায় রাশিয়ার সমালোচনা করা উচিত ছিল। আবার ভারতের অভ্যন্তরেও অনেকে মনে করতে পারেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া দরকার। কিন্তু ভারতের সামনে বাস্তবতার প্রশ্নটিও রয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পর্ক একদিনে বদলে ফেলা সম্ভব নয়।

তাই মোদীর শান্তির আহ্বানকে কোনও নাটকীয় কূটনৈতিক পরিবর্তনের সংকেত না ধরে ভারতের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’-এরই অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।যুদ্ধ বন্ধ হবে কবে, তা এখনই বলা কঠিন। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার— শান্তির জন্য শুধু আহ্বান যথেষ্ট নয়; যুদ্ধরত পক্ষগুলির রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাস্তব সমঝোতার প্রয়োজন। মোদীর আবেদন সেই সদিচ্ছা তৈরিতে কতটা সাহায্য করবে, তা ভবিষ্যৎই বলবে।

এই মুহূর্তে পুতিনের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, তিনি এখনও যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে দিল্লির বন্ধুত্বপূর্ণ আবেদন তিনি শুনবেন, সম্মান করবেন— কিন্তু তার ভিত্তিতে যুদ্ধের গতি বা কৌশল বদলাবেন, এমন আশা করার কারণ এখনও খুব কম।

তবু শান্তির কথা বলা বন্ধ করা যাবে না। কারণ যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই ফিরতে হয়। প্রশ্ন শুধু, সেই টেবিলে ফিরতে কত প্রাণ, কত অর্থ এবং কতটা ধ্বংসের মূল্য দিতে হবে।