নিজের তৈরি বুদ্ধির কাছেই কি হার মানবে মানুষ?

প্রতীকী চিত্র

মানুষ আগুন আবিষ্কার করেছিল অন্ধকার দূর করার জন্য। সেই আগুনই এক দিন অস্ত্র হয়ে উঠল। পরমাণুর শক্তিকে মানুষ কাজে লাগাল বিদ্যুতের জন্য। সেই শক্তিই আবার তৈরি করল ধ্বংসের ভয়ঙ্কর অস্ত্র। সভ্যতার ইতিহাস তাই শুধু আবিষ্কারের কথা বলে না। প্রতিটি আবিষ্কারের সঙ্গে তার ব্যবহারের দায়ও মানুষের কাঁধে এসে বসে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সামনে দাঁড়িয়ে সেই পুরনো প্রশ্নটিই আজ আরও গভীর হয়ে ফিরে এসেছে। মানুষ কি এমন এক বুদ্ধি তৈরি করছে, যার ক্ষমতা এক দিন তার স্রষ্টাকেই অতিক্রম করতে পারে?

সম্প্রতি অ্যানথ্রপিকের প্রাক্তন গবেষক জেকব কক্সন সামাজিক মাধ্যমে একটি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা বহু মানুষ ব্যক্তিগত ভাবে আশঙ্কা করেন যে এই দশকের শেষ নাগাদ অত্যন্ত শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য ভয়াবহ বিপদ তৈরি করতে পারে। প্রকাশ্যে অনেক গবেষক ও প্রযুক্তি-নির্বাহী তাঁদের ভাষা সংযত রাখেন। ব্যক্তিগত আলোচনায় তাঁদের উদ্বেগ অনেক বেশি— এমনই দাবি কক্সনের।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ভয় কোনও বাইরের পর্যবেক্ষকের নয়। যে মানুষগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন, তাঁরাই তার বিপদের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। অ্যানথ্রপিকের গবেষক ইভান হুবিঞ্জারও কক্সনের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত অনুমান অনুযায়ী, আগামী এক দশকের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে মানবজাতির সম্পূর্ণ ধ্বংসের সম্ভাবনা দশ শতাংশেরও বেশি।


তবে এই সংখ্যাকে বৈজ্ঞানিক ভবিষ্যদ্বাণী বলে দেখা ঠিক হবে না। এটি একজন গবেষকের ব্যক্তিগত ঝুঁকির-অনুমান। আগামী দশ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে হত্যা করবে— এমন কোনও প্রমাণও নেই। সুতরাং আতঙ্ক ছড়ানোও যেমন দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়, তেমনই এই সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

কারণ আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য অত্যন্ত শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য থাকতে পারে। আজকের যন্ত্র মানুষের নির্দেশ অনুসরণ করে। প্রশ্নের উত্তর দেয়। তথ্য বিশ্লেষণ করে। লেখা ও ছবি তৈরি করে। গবেষণার কাজে সাহায্য করে। কিন্তু ভবিষ্যতের কোনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি নিজের গবেষণা নিজে পরিচালনা করতে পারে, নিজের ক্ষমতা বাড়ানোর পথ নিজেই খুঁজে নিতে পারে এবং মানুষের নির্দেশের বাইরে গিয়ে জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করে—তখন প্রশ্নটি প্রযুক্তির দক্ষতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রশ্ন উঠবে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মানুষের উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধের সামঞ্জস্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য দিল। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে যন্ত্র এমন একটি পথ বেছে নিল, যা মানুষের কাছে অপ্রত্যাশিত বা বিপজ্জনক। যন্ত্রের কাছে কাজটি সফল। মানুষের কাছে ফলটি বিপর্যয়কর। এই ব্যবধানই ভবিষ্যতের অন্যতম বড় ঝুঁকি।

বিপদের পরিসর আরও বড় হতে পারে। শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, আর্থিক ব্যবস্থা, সামরিক প্রযুক্তি, গবেষণাগার এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল পরিকাঠামোর সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত হয়ে যায়, তখন তার ভুল সিদ্ধান্তের প্রভাব একটি কম্পিউটারের পর্দায় আটকে থাকবে না। তা পৌঁছে যেতে পারে বাস্তব জীবনে। সভ্যতা যত বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হচ্ছে, এই সম্ভাবনার গুরুত্বও তত বাড়ছে।
তবু আতঙ্কের বদলে প্রয়োজন যুক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে ধ্বংস করবেই— এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি এখনও নেই। আবার প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণই করবে— এমন নিশ্চয়তারও কারণ নেই। ইতিহাসের শিক্ষা হল, কোনও প্রযুক্তি নিজে কল্যাণকর বা ধ্বংসাত্মক নয়। মানুষের ব্যবহার, নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্দেশ্য তাকে যে কোনও দিকে নিয়ে যেতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে দায়িত্বটি তাই অন্য যে কোনও প্রযুক্তির চেয়ে বড়। কারণ এটি মানুষের শারীরিক শক্তির বিকল্প তৈরি করছে না শুধু। মানুষের চিন্তা, ভাষা, পরিকল্পনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করছে। তার ক্ষমতা কোথায় গিয়ে থামবে, তার সুনির্দিষ্ট সীমা আজও মানুষের জানা নেই।

এই জায়গাতেই সভ্যতার আসল পরীক্ষা। কে আগে সবচেয়ে শক্তিশালী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করবে— এই প্রতিযোগিতা চলতেই পারে। কিন্তু তার সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে চলতে হবে আর একটি প্রতিযোগিতা— কে সবচেয়ে নিরাপদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করতে পারবে। গবেষণার গতি যেমন বাড়বে, তেমনই বাড়াতে হবে নৈতিক বিধি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের কাঠামো।

মানুষ এত দিন প্রকৃতির শক্তিকে বশে আনার চেষ্টা করেছে। এখন সে নিজের বুদ্ধির একটি কৃত্রিম প্রতিরূপ তৈরি করছে। সেই প্রতিরূপ যদি এক দিন মানুষের বুদ্ধির সীমা অতিক্রম করে, তখন মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মেধা একা থাকবে না। তার সঙ্গে প্রয়োজন হবে সংযমের।

জেকব কক্সনের সতর্কবার্তা সত্যি হবে কি না, আজ কেউ জানেন না। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের মূল্য অন্য জায়গায়। তিনি ভবিষ্যৎ ঘোষণা করেননি। তিনি কেবল একটি প্রশ্ন সামনে এনেছেন। মানুষ যে বুদ্ধি তৈরি করছে, এক দিন সেই বুদ্ধির চেয়ে মানুষের বিবেক কি শক্তিশালী থাকবে? সভ্যতার ভবিষ্যৎ হয়তো শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তরের উপরেই নির্ভর করবে।