কেন হারিয়ে যাচ্ছে বই পড়ার অভ্যাস

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

রীপা পাল: একসময় বই ছিল মানুষের জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষের অবসর সময় কাটানোর প্রধান মাধ্যম ছিল বই। ছোটদের হাতে দেখা যেত গল্পের বই, কিশোরদের হাতে উপন্যাস আর বড়দের হাতে সংবাদপত্র কিংবা সাহিত্যচর্চার বই। বই শুধু জ্ঞান অর্জনের উপায় ছিল না, বরং মানুষের চিন্তা, কল্পনা, মূল্যবোধ এবং ব্যক্তিত্ব গঠনের অন্যতম মাধ্যম ছিল। একটি বই মানুষকে নতুন পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিত, নতুনভাবে ভাবতে শেখাত এবং বাস্তব জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করত।
কিন্তু বর্তমান সময়ে এসে সেই বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এখন অনেকেই বই পড়াকে প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছে। পরীক্ষার জন্য পাঠ্যবই পড়া ছাড়া অন্য বইয়ের প্রতি আগ্রহ অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই পরিবর্তন বেশি চোখে পড়ে। প্রশ্ন হল— কেন বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে?
বর্তমান যুগ প্রযুক্তিনির্ভর যুগ। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে অনেক সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ধরনও বদলে দিয়েছে। এখন মানুষ অবসর সময় পেলেই বইয়ের পরিবর্তে মোবাইল ফোন হাতে নেয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ভিডিও, শর্ট ভিডিও, গেম এবং বিভিন্ন অ্যাপ মানুষের মনোযোগ দখল করে নিয়েছে। মানুষ খুব দ্রুত বিনোদন পেতে চায়। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও কিংবা ছোট ছোট পোস্ট এখন মানুষের কাছে বেশি আকর্ষণীয়। ফলে ধৈর্য ধরে দীর্ঘ সময় মনোযোগ দিয়ে বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে। একটি বই পড়তে সময়, ধৈর্য এবং মনোযোগ প্রয়োজন হয়, কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই সেই ধৈর্য কমে এসেছে।
অনেকে মনে করেন, ফেসবুক পোস্ট, ব্লগ বা ছোট ছোট তথ্য পড়েই জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু বইয়ের গভীরতা, বিশ্লেষণ এবং চিন্তার জায়গা এই ধরনের ছোট কনটেন্টে পাওয়া যায় না। ফলে মানুষের চিন্তাশক্তি ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
শিশুদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। আগে শিশুরা রূপকথার গল্প, ছড়া, কিশোর সাহিত্য এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক বই পড়ে বড় হতো। এখন অধিকাংশ শিশুর শৈশব কাটছে মোবাইল ফোন, ট্যাব বা টেলিভিশনের সামনে। অনেক অভিভাবক শিশুদের শান্ত রাখার জন্য খুব ছোট বয়সেই মোবাইল হাতে তুলে দেন। এতে শিশুরা সহজেই স্ক্রিনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হওয়ার আগেই তারা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায়। এর ফলে তাদের কল্পনাশক্তি, মনোযোগ এবং সৃজনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বই পড়া শিশুদের চিন্তাশক্তিকে সমৃদ্ধ করে, কিন্তু মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার শিশুদের ধীরে ধীরে অস্থির করে তুলছে।
বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা। বর্তমানে শিক্ষার্থীদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে ভালো নম্বর পাওয়া। অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজ— সবাই শিক্ষার্থীদের ফলাফলের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়াকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করে গল্পের বই বা সাহিত্য পড়লে সময় নষ্ট হবে। এই ধারণা ধীরে ধীরে তাদের বই থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অথচ সহপাঠ্য বই মানুষের ভাষাজ্ঞান, চিন্তাশক্তি এবং সৃজনশীলতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বর্তমানে কোচিং সংস্কৃতিও বই পড়ার অভ্যাস কমিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীরা সারাদিন কোচিং, টিউশন এবং পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। ফলে নিজেদের আনন্দের জন্য বই পড়ার সুযোগ খুব কম থাকে। একসময় ছুটির দিনে শিশুরা গল্পের বই পড়ত, লাইব্রেরিতে যেত কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করত। এখন সেই পরিবেশ খুব কম দেখা যায়। শিশুদের সময় এখন ভাগ হয়ে গেছে মোবাইল, অনলাইন ক্লাস এবং পরীক্ষার চাপে।
পারিবারিক পরিবেশও বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আগে পরিবারে বই পড়ার সুন্দর পরিবেশ ছিল। বাবা-মা সংবাদপত্র পড়তেন, সাহিত্যচর্চা করতেন, বড় ভাই বা বোন উপন্যাস পড়ত— এসব দেখে ছোটদের মধ্যেও বই পড়ার আগ্রহ তৈরি হতো। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ পরিবারেই সবাই মোবাইল ফোনে ব্যস্ত। একই ঘরে বসে থেকেও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আগের মতো কথাবার্তা বা একসঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস কমে গেছে। যখন শিশুরা বড়দের বই পড়তে দেখে না, তখন তারাও বইয়ের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।
লাইব্রেরি সংস্কৃতির অবক্ষয়ও একটি বড় কারণ। একসময় পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার ছিল। সেখানে শিক্ষার্থী, তরুণ এবং বয়স্ক মানুষ নিয়মিত বই পড়তে যেতেন। লাইব্রেরি শুধু বই পড়ার জায়গা ছিল না, বরং জ্ঞানচর্চা ও আলোচনা করার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে অনেক লাইব্রেরি অবহেলিত অবস্থায় রয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই লাইব্রেরিতে যাওয়ার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছে। ফলে বইয়ের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাচ্ছে।
সমাজের পরিবর্তিত জীবনধারাও বই পড়ার অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে। এখন মানুষ সবকিছু খুব দ্রুত পেতে চায়। ধৈর্য ধরে সময় নিয়ে কিছু করার প্রবণতা কমে গেছে। বই পড়া একটি ধীর এবং মনোযোগনির্ভর কাজ। কিন্তু বর্তমান যুগে মানুষ দ্রুত বিনোদন ও দ্রুত তথ্য পাওয়ার দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। ফলে বইয়ের মতো গভীর মনোযোগের বিষয়গুলো অনেকের কাছে কঠিন মনে হচ্ছে।
বই পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার ফলে সমাজেও নানা নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বই মানুষের চিন্তাশক্তি বাড়ায়, ভাষাকে সমৃদ্ধ করে এবং মনকে গভীর করে তোলে। যারা নিয়মিত বই পড়ে, তারা সাধারণত বেশি ধৈর্যশীল, যুক্তিবাদী এবং সৃজনশীল হয়। বই মানুষকে বিভিন্ন সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত করে। কিন্তু বই পড়ার অভ্যাস কমে গেলে মানুষের চিন্তার পরিধিও সংকুচিত হয়ে যায়। তখন মানুষ সহজেই গুজব, ভুল তথ্য কিংবা অগভীর চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে সাহিত্যচর্চা কমে যাওয়ার কারণে ভাষার সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তবে আশার কথা হলো, এখনও অনেক মানুষ বইকে ভালোবাসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বর্তমানে বই নিয়ে আলোচনা, রিভিউ এবং পাঠচক্রের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। যদি পরিবার, বিদ্যালয় এবং সমাজ একসঙ্গে উদ্যোগ নেয়, তাহলে বই পড়ার অভ্যাস আবারও ফিরিয়ে আনা সম্ভব।বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানোর জন্য প্রথমে পরিবার থেকেই উদ্যোগ নিতে হবে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের গল্প শোনানো এবং বই উপহার দেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শুধু পরীক্ষার ফল নয়, জ্ঞান অর্জনের আনন্দও শিক্ষার্থীদের শেখাতে হবে।
প্রযুক্তিকেও ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব। বর্তমানে ই-বুক, অডিওবুক এবং অনলাইন লাইব্রেরির মাধ্যমে সহজেই বই পড়া যায়। যদি মানুষ প্রযুক্তিকে শুধু বিনোদনের জন্য নয়, জ্ঞান অর্জনের জন্যও ব্যবহার করে, তাহলে বই পড়ার অভ্যাস নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে। প্রযুক্তি বইয়ের শত্রু নয়, বরং সঠিকভাবে ব্যবহার করলে বইকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হতে পারে। নতুন প্রজন্ম যদি আবার বইয়ের প্রতি আগ্রহী হয়, তাহলে সমাজ আরও জ্ঞানসমৃদ্ধ, সচেতন এবং মানবিক হয়ে উঠবে।