কেন আক্রান্ত রামমোহন? চিন্তার মুক্তি অসহ্য বলে?

ফাইল চিত্র

শতদল ভট্টাচার্য

আধুনিক ভারতে বাংলা ও বাঙালির জীবনধারায় ভালো-মন্দের তথা জমা-খরচের হিসাব-নিকাশ নানা ভাবে হতে পারে। কিন্তু একটি বিষয়ে আমরা উচ্চকণ্ঠে একটা কথা বলতে পারি – বঙ্গভূমি ও বাঙালির সংস্কৃতি ও জীবনচর্যার মধ্যে বহু যুগ ধরে যে উদার মানবতাবোধ ও চিন্তার চলিষ্ণুতা দেখা গেছে, আজও তা অনেকাংশে বাঙালিকে এগিয়ে রেখেছে। এটা নতুন করে উপলব্ধি করতে পারি যখন চারপাশে বিপরীত কিছু ঘটতে দেখি। ‘কন্ট্রাস্ট’ দিয়ে ভালো বোঝা যায়। ইদানীং আমরা দেখতে পেলাম যে, বঙ্গ-বহির্ভূত এক ব্যক্তি, যিনি অন্য কোন রাজ্যের এক ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতা বটেন, রাজা রামমোহন রায় সম্বন্ধে নির্দ্বিধায় কিছু অসম্মানকর, দ্বেষদুষ্ট ও তিক্ত মন্তব্য প্রচার করে এক অসুস্থ মানসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। এই ক্রোধের কারণ কী? কারণ আর কিছুই নয়, ভারতে রামমোহন সামাজিক প্রগতির অগ্রদূত ছিলেন এবং যুগোপযোগী সমাজ-সংস্কারে ইংরেজ শাসনতন্ত্রের সহায়তা আদায় করে নিয়েছিলেন। এই ছিল তাঁর অপরাধ।

যাই হোক, আজ দেশের অমৃতকালে এই এক বঙ্গ-বহির্ভূত ব্যক্তির কুৎসিত মন্তব্যগুলি সম্বন্ধে পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা যতটাই হয়ে থাকুক না কেন , ভারতের অন্যান্য অঞ্চলগুলিতে জনমানসে এই ধরণের কুমন্তব্য ও অপপ্রচারের কিছু প্রভাব পড়ে থাকলে তা এক পরিতাপজনক ব্যাপার বলে গণ্য করতে হবে। কারণ রামমোহন শুধু বঙ্গজনের নয়, সারা ভারতবর্ষের গর্বস্থল। তাই রামমোহন-নিন্দা নিয়ে শুধু বাঙালিরা প্রতিবাদমুখর হলেই চলবে না, সারা দেশের মানুষকেই এমন চূড়ান্ত অসভ্য অপপ্রচারের প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে হবে। রামমোহনের মতো মহামানব সম্পর্কে অশালীনভাবে নিন্দা ও কুৎসা করলে দেশের কোনোই উপকার হয় না, কেবল কুৎসাকারীর মনের গরল বাইরে বেরিয়ে সামাজিক পরিবেশকে দূষিত করে। কুসংস্কার ও মূঢ়তার এই নির্লজ্জ প্রকাশ আসলে এটাই ইঙ্গিত করছে যে, দেশের মধ্যে এক বিশেষ ধরণের মানসিক রুগ্নতা ক্রমশ – কিন্তু দ্রুত – বিস্তৃত হয়ে পড়ছে। কুসংস্কার চিরকাল মানুষকে ভিতর থেকেই পচিয়ে দেয়। অপশিক্ষার ফলে ও রাষ্ট্রনৈতিক ক্ষমতার দর্পে মানুষের স্বভাব ও ব্যবহারের বিকৃতি কত দূর পর্যন্ত প্রসারিত হতে পারে, এই ঘটনাটি তার এক উৎকট নিদর্শন। শিক্ষার দৈন্যের ফলে আর নির্বুদ্ধিতার প্রভাবে ধরাকে সরা জ্ঞান করা তো আত্মবিস্মৃত মানুষের এক চিরকালীন রোগ।


সঙ্কীর্ণতামুক্ত উদার ও জঙ্গম জীবনাদর্শের সঙ্গে যাদের কোনো পরিচয় নেই, যাদের ভাবনা-চিন্তার মধ্যে যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানচেতনার কোনো স্থান নেই, তাদের কাছ থেকে এই ধরণের অভব্য ও উগ্র আচরণের চেয়ে অন্যরকম কিছু আশাও করা চলে না। যাদের বিচারবুদ্ধির গভীরতা নেই এবং চিন্তার পরিধি অত্যন্ত সঙ্কুচিত, যাদের দৃষ্টি শুধু অতীতের দিকে, তাদের কাছ থেকে কোনো সদর্থক বাণী শোনার প্রত্যাশা আমরা রাখি না। কিন্তু তাদের স্পর্ধিত দুরাচরণকে আমরা কোনো ভাবে প্রশ্রয় দিতে পারি না। রামমোহন রায়কে ও তাঁর জীবনাদর্শকে অশালীন ভাষায় অপমান করার মধ্যে যে অগৌরব আছে তা সারা দেশের পক্ষেই গুরুতর লজ্জার বিষয়। নবজাগৃতির যুগে বাংলা ও বাঙালির মধ্যে যে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক বিকাশের সাধনা অভিব্যক্ত হয়েছিল তাকে অবজ্ঞা ও বিদ্রুপ করার মূঢ় অপপ্রয়াস কেউ দেখালে আমরা তাকে ক্ষমা করব না, তা সেই ‘কেউ’ যত বড় মাতব্বর হোক না কেন। রামমোহন ভারতবর্ষে আধুনিক, উদার ও যুক্তিবাদী মনন-চিন্তনের অগ্রপথিক। ভারতের শাশ্বত জ্ঞানভাণ্ডার বেদান্তকে যেমন তিনি নতুন উৎসাহে জনসমক্ষে প্রচার করেছিলেন, তেমনি নবযুগের আধুনিক আন্তর্জাতিক শিক্ষাকে ভারতে প্রচলিত করার জন্য রামমোহন পূর্ণোদ্যমে সচেষ্ট ছিলেন।

ভয়ঙ্কর সহমরণ প্রথা বিলোপ করে দেশের অসহায় নারীদের জীবন রক্ষায় তাঁর বিপ্লবী ভূমিকা বিশ্বমানবের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এই ধরণের মানুষ প্রতিদিন ঘরে ঘরে জন্মায় না; দেশের অনেক সৌভাগ্য যে রামমোহনের মতো এক মহামানব একদিন আমাদের মধ্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন। ইংরেজদের রাজত্বকালের সেই প্রথম যুগেই পরাধীন ভারতবর্ষের মধ্যে রামমোহনের মতো বিরল এক পুরুষের আবির্ভাব, মননশীলতা ও কর্মযজ্ঞ আন্তর্জাতিক জগতে সম্মান ও সম্ভ্রম আদায় করে নিয়েছিল। সে-সময় রামমোহন যদি সত্য, ন্যায় ও মানবতার আদর্শের প্রদীপশিখাটি এ-দেশের মাটিতে নতুন করে না জ্বালাতেন, রামমোহনের অনুগামীরা যদি তাঁর দৃষ্টি ও দর্শনকে সমাজে লালন-পালন না করতেন, তবে আরো অনেক দিন আমাদের কূপমণ্ডুক হয়েই থাকতে হতো। যে রবীন্দ্রনাথ অখণ্ড ভারতে ও বৃহত্তর বিশ্বে এক অদৃষ্টপূর্ব মানবসত্তা হিসেবে অভিনন্দিত, সেই রবীন্দ্রনাথের মনোজগতের ভিত্তি রামমোহনের ভাবাদর্শকে আত্মীকরণ করেই গঠিত হয়েছিল।

আমরা বুঝতেই পারছি যে, রামমোহনের স্মৃতির উপর এই কদর্য আক্রমণ একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মূল অনেক গভীরে। ভারতের বর্তমান সমাজব্যবস্থা ও শিক্ষাচর্যাকে দেড় বা দুই হাজার বছর পিছনে ঠেলে নিয়ে যেতে কিছু মানুষ খুব উদ্গ্রীব। গোঁড়ামি যাদের বিবেককে আচ্ছন্ন করে রাখে, রামমোহনকে শ্রদ্ধা করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। কিন্তু আজ একবিংশ শতকে কিছু অবিবেচক লোকজন ও তাদের চিন্তাশক্তির জড়তা যদি আমাদের দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, তা হলে দেশের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে বাধ্য।

দেশে কিছুকাল থেকে যেভাবে অবিদ্যার চাষ হয়ে চলেছে, তা দেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক অসুস্থ মানসিক আবর্তের সৃষ্টি করেছে। এটা বোঝাই যাচ্ছে যে, এ-দেশে এখন যুক্তিবাদী ও মুক্তচিন্তক মানুষের সংখ্যা কম হয়ে বদ্ধচিন্তার একটা গড্ডলিকা প্রবাহ চালু থাকলে কিছু লোকের অভিসন্ধি পূরণের পক্ষে সুবিধা হয়। দেশে অন্ধকার যুগ তখনই পুরোপুরি কায়েম হতে পারে যখন মানুষকে আলো আর আঁধারের বৈষম্য ভুলিয়ে দেওয়া যায়। আমাদের দেশে এখন তেমনই একটা প্রচেষ্টা চলছে। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, চণ্ডিদাস, চৈতন্যদেব থেকে শুরু করে পরবর্তী কালের রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রামকৃষ্ণ, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, অরবিন্দ, শিবনাথ শাস্ত্রী, লালন ফকির, সুভাষচন্দ্র, শরৎচন্দ্র, নজরুল – এমন সব অপূর্ব ও বিচিত্র ব্যক্তিত্বের স্বর্ণাভায় আলোকিত বাঙালির সম্পন্ন মনোজগৎ সেই প্রচেষ্টার প্রভাব থেকে যেন আত্মরক্ষা করে চলতে পারে এটাই আমাদের প্রধান আকাঙ্খা। বাঙালি সে-কালে ডিরোজিও-কে দেখেছে, রামতনু লাহিড়ীকে দেখেছে। দেখেছে ব্রাহ্ম আন্দোলন। দেখেছে সমাজতন্ত্র। তাই শিক্ষিত বাঙালির মনের বিবর্তন হয়েছে এক উদার ও চলিষ্ণু সাংস্কৃতিক আবহে। ব্রিটিশ-ভারতে বাংলার পথপ্রদর্শনায় যে রেনেসাঁ তখন এক নতুন যুগান্তর এনে দিয়েছিল, তার মর্মগত আদর্শকে সম্মান করার মতো শিক্ষা ও বিবেকবত্তা সকলের থাকে না। যারা আজ রামমোহনকে সহ্য করতে পারছে না, তারা কাল রবীন্দ্রনাথকেও সহ্য করতে পারবে না। রাবীন্দ্রিক জীবনদর্শনের মূলে রামমোহনের জীবনাদর্শের প্রভাব অসামান্য। রবীন্দ্রনাথের প্রভাবে আপ্লুত আমাদের শিক্ষিত বাঙালি সমাজ প্রায় দেড়-শ বছর ধরে যে সাংস্কৃতিক বিবর্তনে সমৃদ্ধ হয়েছে, তাকে নষ্ট করে দেবার উপযুক্ত একটি আবহাওয়া নির্মাণের প্রয়াস বাংলায় শুরু হয়েছে। আধুনিক সঙ্কীর্ণতামুক্ত চিন্তাধারার বিকাশকে দাবিয়ে রাখতে হলে বাঙালি সমাজের মানবতাবাদী মনীষীদের প্রতি বঙ্গবাসীর শ্রদ্ধাকে বিনষ্ট করতে পারলেই কাজ অনেকটা এগিয়ে যাবে।

এদিকে আবার ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান ও তার মর্মস্থ নৈতিক আদর্শ যতদিন স্বমহিমায় বিরাজ করবে, ততদিন ভারতের পশ্চাৎ-যাত্রা পুরোপুরি শুরু হতে পারছে না। তাই আজ রামমোহন যাদের চক্ষুশূল, তারা ভারতীয় সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইবেই না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মেজাজ-মর্জি যে-পথেই চলুক, বাংলা ও বাঙালির দায়িত্ব এটাই যে, ভারতের গণতান্ত্রিক সংবিধানের উদার ও নিরপেক্ষ আদর্শকে আমরা সবাই যেন বাঁচিয়ে রাখতে পারি। সুলতান-বাদশার যুগকে অতিক্রম করে ব্রিটিশ আমলে নূতন এক আধুনিক ভারতের সূচনা হয়েছিল প্রধানতঃ কলকাতাকে কেন্দ্র করে, বাঙালি সমাজের মহামনীষীদের হাত ধরে। সেই নবজাগৃতির হাত ধরে এসেছিল জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম। ভারতের সেই নবজাগরণ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের পরিণতি যে- সংবিধানের মধ্যে, সেই সংবিধানকে স্বচরিত্রে বিরাজমান ও কার্যকর রাখার জন্য আজকের বাঙালিকে উদ্যোগী হতেই হবে। রামমোহন ও অন্যান্য অগ্রপথিকদের সম্মান জানাবার জন্য এটাই বাঙালির করণীয়।