বিশ্বজিৎ সরকার
নির্বাচন এসে পড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলির প্রচার শুরু হয়েছে জোর কদমে। প্রত্যেক দলই আপন আপন দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে। লোকসভা বা বিধানসভা যে কোনও নির্বাচনে প্রত্যেক দল একটি প্রধান ইস্যুকে কেন্দ্র করে তার প্রধান প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে নির্বাচনী প্রচার তুঙ্গে তোলে। একটা সময় ছিল যখন প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের এই নির্বাচনী ইস্যুর মধ্যে জড়িয়ে থাকতো ব্যাপক মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা। সেদিন আর নেই। এখন নির্বাচনী প্রচার মূলত দলের স্বার্থে, যার ফলে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলন খুব একটা বেশি ঘটে না তাদের নির্বাচনী প্রচারে। এমনকি যে নির্বাচনী ইস্তাহার তারা তৈরি করে তাও সেভাবে প্রচারে আনে না। রাজনীতির অবক্ষয় এবং আদর্শের অভাব এর মূলে। এই মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলির চিন্তাভাবনা মোটামুটি একই সুরে বাঁধা, ফলে আদর্শগত পার্থক্য না থাকায় সেরকম কোনও ইস্যু জনগণের মনে রেখাপাত করে না। পরিবর্তে এই প্রচারে ব্যক্তি কুৎসা এবং বিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি বিষোদগারই মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে। অথচ এই মুহূর্তে সমস্ত দলগুলির কাছেই আছে নানান মোক্ষম ইস্যু। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, সঞ্চিত অর্থের সুরক্ষা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চাপা গভীর উদ্বেগ। কিন্তু এগুলিকে সামনে রেখে মানুষের কাছে যাওয়ায় অনীহা সব রাজনৈতিক দলগুলির।
শিক্ষার কথাই ভাবা যাক। যে কোনও কল্যাণকামী রাষ্ট্র শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের অধিকারকে গুরুত্ব দেয় সর্বাধিক। স্বাধীন ভারতের সংবিধান প্রণেতারা স্বাধীনতার পূর্ব-পুরুষদের ত্যাগ ও আত্মবলিদানের কথা স্মরণে রেখে ১৪ বছর পর্যন্ত সকল শিশুর অবৈতনিক শিক্ষার প্রতি যথেষ্ট যত্নশীল ছিলেন। তাঁদের বিশ্বাস ছিল জাতির মঙ্গলার্থে এই অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি সম্পন্ন করতে দশ বছর যথেষ্ট । কিন্তু তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। ২০০২ সালে ৮৬ তম সংশোধনের মধ্যে তা ১৪ থেকে ৬-এ নামিয়ে আনা হয়। ২০১০ সালে আবার এ ব্যাপারে ব্যাপারে শিক্ষার আইন বলবৎ করে ১৪ বছর পর্যন্ত সকল শিশুর অবৈতনিক শিক্ষার অধিকারের কথা বলা হয়। সেই সময় কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী এই সময়ের বিখ্যাত আইনজীবী কপিল সিব্বল আবেগমথিত কণ্ঠে স্বাধীনতার সেই প্রতিশ্রুতির কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই প্রয়াস ও ব্যর্থ হয়েছে পরবর্তী ১৫ বছরে। আস্তে আস্তে প্রাথমিক শিক্ষা-সহ পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাটাই বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। ধীরে ধীরে সরকারি ব্যবস্থাকে অকেজো করে বেসরকারি ক্ষেত্রকে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।
আজ থেকে চার দশক আগেও বেসরকারি স্কুল ছিল, কিন্তু দেখা গেছে এই বেসরকারি স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতেন বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী ও শিক্ষানুরাগীরা। এই উদ্যোগের পিছনে উৎকৃষ্ট শিক্ষাপ্রণালী, ছাত্রছাত্রীদের মঙ্গল সাধনার মহৎ মনোবাসনা কাজ করত। কিন্তু আজকের এই ব্যবস্থায় ভুজিয়াওয়ালা থেকে শুরু করে কয়লা ব্যবসায়ীদের পদচারণা, যাঁদের অনেকেরই লক্ষ্য শুধু মুনাফা। বিশ্বায়নের খোলা বাজারের সুযোগ নিয়ে এক অনৈতিক ব্যবসায় তারা মগ্ন। এই বেসরকারি ব্যবস্থাতেও অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির শিশুদের জন্য বেসরকারি অনুদানহীন স্কুলে ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষণের কথা। তা মানে না অনেক স্কুল। সম্প্রতি এ ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্ট এক পর্যবেক্ষণে তা মানার জন্য সাংবিধানিক বার্তও দিয়েছে, কিন্তু অবস্থা তথৈবচ। ব্যাপক হারে এই বেসরকারি স্কুলগুলির প্রবর্তনে একেবারে শৈশব অবস্থা থেকে একটা বৈষম্যের প্রাচীর গড়ে তোলা হচ্ছে। কেননা অধিকাংশ সরকারি স্কুলগুলি এখন একেবারে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দারিদ্রপীড়িত ছাত্র-ছাত্রীদের জায়গা। সরকারি স্কুলগুলিতে এমন একটা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে কায়েম করা হয়েছে যেখানে একটু স্বচ্ছল অভিভাবকরা বাধ্য হচ্ছেন ছেলে মেয়েদের এই বেসরকারি স্কুলগুলিতে পাঠাতে। ভাবনা এমন, যেন ওখানে গেলে ভাল চাকরি বাঁধা। ধীরে ধীরে সরকারি স্কুলগুলি তুলে দেওয়া এবং পঠন-পাঠনের পরিবেশ ধ্বংস করার ফলে অভিভাবকরা ছুটছেন সেখানে। এই সরকারি ব্যবস্থায় অব্যবস্থা এবং অপ্রতুলতার (পড়ুন তুলে দেওয়া) মধ্যেই আছে বেসরকারি স্কুলের পিছনে ছোটার মোহ। বেসরকারি স্কুলের রমরমার প্রধান কারণ সরকারি নীতি। সরকার চায় শিক্ষার ভার নিজের কাঁধ থেকে ঝেড়ে ফেলে শিক্ষা ক্ষেত্রকে বিনিয়োগের বাজারে পরিণত করতে। কিন্তু যেটা খুব উদ্বেগের বিষয় তা, হল সরকার এই দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে একেবারে ধৃতরাষ্ট্র সেজে বসে আছে।
ফলে অনেক স্কুলই কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতির মধ্যে চলে না। শিবঠাকুরের আপন দেশে যেন এরাই সব সর্বনাশা নিয়মের কর্তা। যথেচ্ছ ফি বৃদ্ধি। বাজার দরের থেকে অনেক বেশি দরে বই খাতা এমনকি স্কুল ড্রেস কিনতে বাধ্য করা এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। কয়েকটি পূর্বের নাম করা স্কুল বাদে বাকিদের পঠন-পাঠনের মানও খূব খারাপ। এই বেসরকারি স্কুলগুলির সবচেয়ে অনৈতিক কাজ এদের শিক্ষক–শিক্ষিকাদের উপর শোষণ। বেশ কয়েকবছর ধরে এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে যে তথ্য পেয়েছি তাতে চমকে উঠেছি। অনেক স্কুলে ১৫০০ থেকে বেতন শুরু হয়। ১৫০০ থেকে ২০০০ ছাত্রসংখ্যা নিয়ে স্কুলের স্কুলের মাস্টার্স ডিগ্রি প্রাপ্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতন ৫ অঙ্কের নিচে অনেক স্কুলেই। সবচেয়ে যেটা লজ্জার ব্যাপার অনেক স্কুলে এই শিক্ষক সমাজের ডিউটি বাকি অন্য পেশার মত গণ্য করা হয়। কিন্তু তার শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠির কোনও শিথিলতার প্রশ্ন থাকে না। আট-দশ ঘণ্টার কাজে বন্দী রাখা হয়, টিফিনের সময় বার করার জন্যে হিমসিম খেতে হয় তাঁদের। সরকারি ছুটির দিনেও নানান ফন্দি ফিকির বার করে তাঁদের আসতে বাধ্য করা হয়। অনেক স্কুল আবার শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিযুক্তির পর তাঁদের একাডেমিক কাগজপত্র জমা নিয়ে নেয়। কেউ কেউ আবার এ পথে না হেঁটে এক থোক টাকা নিয়ে রাখেন। এই লজ্জার দাসখতের মধ্যেই তাঁরা কাজে যোগ দেন৷ কারণ, ঘরে বসে থাকটা এখনকার ছেলে-মেয়েরা আরও লজ্জার মনে করে। এই অবস্থায় যাঁরা পড়ান তাঁরা যে তাঁর ইনস্টিটিউশনকে কতটা ভালবাসতে পারেন, তা গবেষণার বিষয়। আর ছাত্র-ছাত্রীদেরই বা কতটা উজাড় করে দেন, তা অনুমেয়। এই ধরনের স্কুল বাড়ছে, কেননা এ রকম স্কুলের জন্য স্কুল মালিকের একটা বড় বাড়ি থাকলেই হল। বাকি তো শিক্ষক-শিক্ষিকার সুলভ শ্রমই মূলধন। গোটা দেশেই এই পরিস্থিতি। শিক্ষার বিশ্বায়নের নয়া মডেল। সব রাজনৈতিক দলগুলি এই চিত্র সর্ম্পকে ওয়াকিবহাল, কিন্ত সব চুপ, এ নিয়ে কোনও স্লোগান নেই।
শিক্ষা কেবল একটা চাকরি পাওয়া নয়, কিম্বা শুধু ধোপ-দুরস্ত কেতাবি শিখে কোম্পানির প্রোডাক্ট বিক্রি নয়। সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাঠকেন্দ্র৷ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শক্তিশালী উপাসনা-ঘর। কিন্তু তা আজ নোংরা মুনাফার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। না, এই নিয়ে কোনও রাজনৈতিক দল ভোটের ইস্যুতে নামেনি। এ নিয়ে তাদের মাথা ব্যথাও নেই৷ আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপাল কিন্তু ভেবেছে। এইসব বেসরকারি স্কুল বন্ধ করে সবাইকে সরকারি স্কুলে শিক্ষা দেওয়ার কর্মসুচী নিয়েছে। আমরা যা ভাবতেই পারছি না!