বিশ্ববিপর্যয়ের ঝুঁকি এড়াতে এআইয়ের নিরাপদ ব্যবহার, আন্তর্জাতিক তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন অত্যন্ত জরুরি বিষয় হয়ে উঠেছে।
মানুষের তৈরি প্রযুক্তি একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ এই আশঙ্কাকে নতুন করে সামনে এনেছে। যে প্রযুক্তি চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, গবেষণা ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে, অসতর্ক ব্যবহার ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে সেটিই বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এআই কত দ্রুত উন্নত হচ্ছে, শুধু তা দেখলেই চলবে না– দেখতে হবে, এই শক্তিশালী প্রযুক্তিকে কতটা নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।
এআই গবেষণার অন্যতম পথিকৃৎ এবং পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত জিওফ্রে হিন্টনসহ প্রায় ৪০০ জন বিজ্ঞানীর আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থা গঠনের আহ্বান এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, শক্তিশালী এআই ব্যবস্থার ঝুঁকি কমাতে আরও গবেষণার পাশাপাশি কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তাব্যর্থতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই আহ্বানকে নিছক প্রযুক্তিবিদদের উদ্বেগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, এআইয়ের ঝুঁকির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য, আর্থিক লেনদেন, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা।
এআইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারক্ষেত্র সাইবার নিরাপত্তা। এটি কম্পিউটার নেটওয়ার্কের দুর্বলতা শনাক্ত করতে, সন্দেহজনক কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করতে এবং সাইবার হামলা প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু একই প্রযুক্তি অপরাধীদের হাতেও শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে সফটওয়্যারের দুর্বলতা খুঁজে বের করা, প্রতারণামূলক বার্তা তৈরি করা কিংবা বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণের মতো কাজে এআইয়ের অপব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
বিপদের মাত্রা বাড়ে যখন এআইকে শুধু প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সফটওয়্যার চালানো, ইন্টারনেট ব্যবহার, কোড সম্পাদনা করা কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল ব্যবস্থা পরিচালনার ক্ষমতা দেওয়া হয়। তখন নিরাপত্তার ত্রুটি, ভুল নির্দেশ বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। পরীক্ষামূলক এআই ব্যবস্থা নির্ধারিত সীমার বাইরে কাজ করলে তা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। তবে প্রতিটি ঘটনাকে আসন্ন বিশ্ববিপর্যয়ের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই জরুরি।
বিজ্ঞানীদের প্রস্তাবিত ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরীক্ষামূলক এআই মডেলকে ইন্টারনেট ও অন্যান্য সংবেদনশীল ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা। প্রযুক্তির ভাষায় একে বলা হয় ‘এয়ার-গ্যাপিং’। এতে পরীক্ষাধীন মডেল বাইরের নেটওয়ার্কে সরাসরি প্রবেশ করতে পারে না, ফলে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিধি কমানো সম্ভব হয়। তবে শুধু নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন রাখলেই সব ঝুঁকি দূর হয় না; প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, তথ্য স্থানান্তরের নিরাপত্তা, মানবীয় তদারকি এবং নিয়মিত পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হয়।
এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলি নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বললেও প্রশ্ন থেকে যায়— নিজেদের তৈরি প্রযুক্তির নিরাপত্তা যাচাইয়ের দায়িত্ব কি পুরোপুরি তাদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া যায়? প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর দ্রুত পণ্য বাজারে আনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ করা এবং প্রতিযোগীদের ছাড়িয়ে যাওয়ার চাপ থাকে। নিরাপত্তা পরীক্ষায় সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়, কখনো পণ্য উৎপাদনও পিছিয়ে দিতে হয়। ফলে ব্যবসায়িক স্বার্থ ও জননিরাপত্তার মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে।
এ কারণে শুধু স্বেচ্ছামূলক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বাধীন তদারকি, বিপদের মাত্রা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং গুরুতর ত্রুটি বা ব্যর্থতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর নিয়ম। কোনও প্রতিষ্ঠানের এআই ব্যবস্থার নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হলে তা গোপন রাখার সুযোগ থাকা উচিত নয়। নিরাপত্তার ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঠেকানোর জন্য তথ্য প্রকাশের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তবে নিয়ন্ত্রণের অর্থ প্রযুক্তির বিকাশ বন্ধ করে দেওয়া নয়। অতিরিক্ত জটিল বা অস্পষ্ট নিয়ম নতুন উদ্যোক্তা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাধারণ কাজে ব্যবহৃত ছোট এআই মডেল এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো পরিচালনায় সক্ষম শক্তিশালী ব্যবস্থার জন্য একই মাত্রার নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে ঝুঁকিভিত্তিক নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। উদ্দেশ্য হবে বিপদ কমানো, উদ্ভাবনের পথ বন্ধ করা নয়।
এআইয়ের ঝুঁকি কোনও একটি দেশের সীমানায় আটকে থাকে না। একটি দেশে তৈরি প্রযুক্তি অন্য দেশের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সরকারি নেটওয়ার্ক কিংবা যোগাযোগব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর অবস্থান শনাক্ত করাও অনেক সময় কঠিন। ফলে কোনও একটি দেশের একক উদ্যোগে সব ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয়।
এ কারণে আন্তর্জাতিক তদারকি সংস্থা গঠনের প্রস্তাব গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এমন সংস্থা এআই নিরাপত্তার সাধারণ মান নির্ধারণ, নিরাপত্তা-ব্যর্থতার তথ্য বিনিময়, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন দেশের গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে পারে। বিমান চলাচল ও পারমাণবিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নির্দিষ্ট মান অনুসরণের যে ব্যবস্থা রয়েছে, এআইয়ের ক্ষেত্রেও সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে।
তবে শুধু একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তার ক্ষমতা, অর্থায়ন, সদস্যদেশগুলোর সহযোগিতা এবং নিয়ম অমান্য করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে। বড় প্রযুক্তি কোম্পানি ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোরও নীতিনির্ধারণে কার্যকর অংশগ্রহণ থাকা প্রয়োজন।
মনে রাখতে হবে, এআই শুধু বিপদের উৎস নয়, বিপুল সম্ভাবনারও বাহক। রোগ শনাক্তকরণ, নতুন ওষুধ আবিষ্কার, কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি, শিক্ষায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার, ভুয়া তথ্যের বিস্তার, স্বয়ংক্রিয় প্রতারণা এবং পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্তও সমাজে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। তাই এআইয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গোপনীয়তা, স্বচ্ছতা ও মানুষের অধিকার রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
সরকারকে কার্যকর আইন ও নীতি প্রণয়ন করতে হবে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার নিচে রাখা চলবে না, আর গবেষকদের স্বাধীনভাবে ঝুঁকি পরীক্ষা ও তা প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। কোনও সিদ্ধান্ত এআইয়ের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে বলে তার দায় প্রযুক্তির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে।
জিওফ্রে হিন্টন-সহ বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তার মূল তাৎপর্য এখানেই— শক্তিশালী এআই তৈরি করার সামর্থ্য অর্জন করাই যথেষ্ট নয়, সেটিকে নিরাপদে পরিচালনার সামর্থ্যও অর্জন করতে হবে। প্রতিটি আশঙ্কাকে নিশ্চিত বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হিসেবে না দেখে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও আগাম সতর্কতার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ, প্রযুক্তির কিছু ভুলের মূল্য দিতে হতে পারে অসংখ্য মানুষকে।
অতএব, এআইয়ের লাগাম টানার প্রশ্নটি প্রযুক্তির অগ্রগতির বিরোধিতা নয়, বরং অগ্রগতিকে মানবকল্যাণের পথে পরিচালিত করার দাবি। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, স্বাধীন তদারকি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সমন্বয় ঘটাতে পারলেই এআইয়ের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তার বিপদ কমানো সম্ভব হবে। মানুষের তৈরি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত মানুষেরই দায়িত্ব।