ইরান আজ কোনপথে?

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

শামীম হক মণ্ডল

এক ইরানি তরুণীর মুখে জলন্ত সিগারেট, আর সেই আগুনে পুড়ছে খামেনেইয়ের ছবি আঁকা পোস্টার। ইন্টারনেটের দৌলতে এ ছবি আমরা অনেকই দেখেছি। ইরানের তরুণ প্রজন্ম, বর্তমান সরকার তথা ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের ওপর ক্ষুব্ধ। তবে কি নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, তথা ভারতীয় উপমহাদেশে থাকা দেশগুলোর মতো অধুনা পারস্য প্রবল জনরোষের শিকার, নাকি ইজরায়েল বা আমেরিকার হাত আছে এর পিছনে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে, আমাদের একবার ইরানের অতীতে উঁকি দিতে হবে।

পশ্চিম এশিয়ার তেলপ্রধান এই দেশটির কথা মাথায় এলে আগে মনে পড়ে শিয়া সম্প্রদায়ের কথা; পৃথিবীর বেশিরভাগ শিয়া মুসলিম এখানে বসবাস করেন। কিন্তু সেই পরিচয় বেশিদিনের নয়। ইসলামের সংস্পর্শে আসার অনেক আগে থেকেই জাতিগত ভাবে তাঁরা পারসিক, এবং এই পরিচয়কে এখনো তাঁরা রীতিমতো ধারণ করেন। নওরোজ, ইয়ালদা— এসব উৎসব তো সেই প্রাচীন সাংস্কৃতির অংশ। তাঁরা মনে করেন, পশ্চিম এশিয়া তথা পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় সংস্কৃতিতে, মননে ইরান ঋদ্ধ। যদিও তাঁদের দাবি অমূলক নয়; গাজ্জালীর মতো বিজ্ঞ পণ্ডিত, জালালুদ্দিন রুমির মতো মর্মস্পর্শী কবির দেশ ইরান।


এছাড়াও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচুর মুক্তমনা মানুষের আবির্ভাব ঘ​টেছে এখানে। সেই দেশে জোরপূর্বক ধর্মীয় অনুশাসনকে চাপিয়ে দেওয়া, অর্থাৎ ধর্মীয় রীতিনীতি মানতে বাধ্য করার বিষয়টি তরুণ প্রজন্মের কাছে ভালো লাগেনি। সেজন্য বহুদিন ধরেই বিভিন্ন অসন্তোষ ছিল জনমানসে, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সম্প্রতি। সোজা কথায়, ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের স্ফুরণ ঘটেছে মানুষের মধ্যে। শুধু কি তাই? গত বছর আমরা দেখেছি ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে ক্রমাগত ঠান্ডা যুদ্ধে জড়িয়েছে তেহরান; সংঘাতের আবহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের প্রথম সারির পারমাণবিক কেন্দ্রগুলি।

যুদ্ধকালীন এই পরিস্থিতি সামলাতে রীতিমতো নাজেহাল হয়ে পড়েছে দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো। উপরন্তু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তো আছেই। সেই আঁচ এসে পড়েছে জনজীবনে। পার্শ্ববর্তী দেশের নাগরিকরা (দুবাই, কুয়েত বা কাতার) যখন সমৃদ্ধি ও বিলাসিতার অবগাহনে মত্ত, তখন নিজেদের পরিস্থিতি দেখে হীনমন্যতায় ভুগছে দেশের তরুণ প্রজন্ম। কারণ তারাও তো চায় পশ্চিমা দুনিয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশের শ্রীবৃদ্ধি হোক, কিন্তু সেই পথে পুরোপুরি যেতে না পেরে তারা আবার পারস্য উপসাগরের তীরে এসে আছড়ে পড়ছে। অস্বাভাবিক মূল‍্যবৃদ্ধি, লাগামছাড়া বেকারত্ব সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার, কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসন চাপিয়ে দিতে ছাড়ছে না। ফলে মানুষজন বিদ্রোহী হয়ে উঠছেন। তবে এবারই প্রথম নয়, এর আগে অনেকবার বিপ্লবের মুখ দেখেছেন ইরানের জনগণ। বর্তমানের প্রশাসন, ইসলামিক রিপাবলিকের জন্মই হয়েছে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বিংশ শতকের কথা যদি বাদও দিই, বছর তিনেক আগের নারী আন্দোলন বা একদশক আগের সবুজ বিপ্লবের সময় প্রশাসন অত্যন্ত কড়া হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু এবারের তৎপরতা তুলনামূলক কম।

সমাজের নিম্নবিত্ত শ্রেণীর পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও ক্ষেত্রবিশেষে উচ্চবিত্ত লোকজন সরকারের চাপিয়ে দেওয়া অনুশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ। এই জনগণই গতবছর ইজরাইলের সঙ্গে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধ চলাকালীন খামেনেই প্রশাসনকে সাহস ও সমর্থন জুগিয়েছিল। সেই সময় ইজরায়েল চেষ্টা করেছিল, যদি কোনোভাবে ইরানে গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি করা যায়, কিন্তু সে ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। দেশের স্বার্থে, মানুষজন সব ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছেন। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই। ইসলামিক রিপাবলিক ছেড়ে, তাহলে কি ইরানিরা শাহ পরিবারের দিকে ঝুঁকছে? না, এলাকাভিত্তিক সমীক্ষা সে কথা বলে না।

ইরানের সাধারণ জনগণ কট্টরপন্থী ডানপন্থী বা দুর্নীতিবাজ বামপন্থী, কোনও পক্ষকে চাইছেন না; বরং তাঁরা এমন সরকারের পক্ষপাতী, যে জনগণের সমস্যাকে মূল্য দেবে, সেই সঙ্গে স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ বজায় রাখবে। সোজা কথায়, জনগণের ওপর জোর করে কঠোর ধর্মীয় রীতিনীতি চাপিয়ে দেবে না। এই রকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কি সেনা অভিযান করে ইরানের সরকার ফেলে দিতে পারে? যেমনটি আমরা আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়াতে দেখেছি। নাকি নিকোলাস মাদুরের মতো খামেনেইকে বন্দী করে ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর থাবা বসাবেন ট্রাম্প? আমেরিকা কোন পন্থা নেবে, সেটা তো সময় বলবে, কিন্তু নিম্নমুখী অর্থনীতির সর্পিল ফাঁদে আটকে পড়া পারস্য উপসাগরীয় এই দেশটিতে জনরোষ ক্রমশ বাড়বে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।