ভাষার ভবিষ্যৎ কোথায়? চ্যাটিংয়ের শর্টকাট বনাম প্রমিত বাংলা

Photo: Pexels

ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির চিন্তা, সংস্কৃতি, দর্শন ও সামগ্রিক মননের আয়না। যুগ যুগ ধরে সময়ের প্রয়োজনে ভাষার বিবর্তন ঘটেছে। প্রযুক্তির অভিঘাত, নতুন পেশার বিস্তার এবং ভিন্ন সংস্কৃতির সংস্পর্শে নতুন শব্দের জন্ম হয়েছে, পুরোনো অপ্রয়োজনীয় শব্দ বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গেছে। ভাষার এই রূপান্তর জৈবিক এবং স্বাভাবিক। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল বিপ্লবের যে ঝড়ের মুখোমুখি আমরা হয়েছি, তা ভাষার ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে দ্রুতগতির পরিবর্তন। এই রূপান্তরের মধ্যমণি হলো ‘চ্যাটিং’ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাৎক্ষণিক বার্তার আদান-প্রদান। এই গতির ঘূর্ণিপাকে পড়ে প্রশ্ন জাগে— আমরা কি তথ্য বিনিময়ের গতি বাড়াতে গিয়ে ভাষার মৌলিক ব্যাকরণ, যুক্তিবোধ, নান্দনিক প্রকাশক্ষমতা এবং চিন্তা প্রকাশের গভীরতা হারিয়ে ফেলছি?

আজকের ডিজিটাল জীবনে বার্তা আদান-প্রদান ছাড়া এক মুহূর্তও কল্পনা করা যায় না। ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ইনস্টাগ্রামের চ্যাটবক্সে যোগাযোগের মূল শর্ত হলো ক্ষিপ্রতা বা দ্রুত সাড়া দেওয়া। এই ক্ষিপ্রতার চাপে ব্যাকরণ, যতিচিহ্ন কিংবা সম্পূর্ণ বাক্যের কাঠামো রক্ষার চেয়ে বার্তাটি অপর প্রান্তের মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে উদ্ভাবিত হয়েছে এক ধরনের বিকল্প ভাষাভঙ্গি।

এখানে লক্ষণীয় দুটি ধারা স্পষ্ট— ১. রোমান হরফে বাংলা (বাংলিশ): বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তে ইংরেজি হরফে ধ্বনিভিত্তিক বাংলা লেখা। যেমন—‘কোথায় আছো?’ লেখার বদলে ‘kothay acho?’ বা ‘ami ekhon ashchi’। ২. ইংরেজি ও মিশ্র শর্টকাট: সময় ও শ্রম বাঁচাতে শব্দকে কেটে ছেঁটে সংক্ষেপ করা। যেমন—‘bcz’ (because), ‘u’ (you), ‘idk’ (I don’t know), কিংবা বাংলার ক্ষেত্রে ‘kno’ (কেন), ‘hbe’ (হবে), ‘amr’ (আমার), ‘thnkx’ ইত্যাদি।


বন্ধু ও সমবয়সীদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আড্ডায় এই ধরনের সংক্ষেপ কোনো বাধা নয়; বরং তা সময় বাঁচায় এবং দ্রুত ভাব বিনিময়ে সাহায্য করে। কিন্তু বিপত্তির সূচনা হয় তখনই, যখন এই অনানুষ্ঠানিক অভ্যাস মানুষের মস্তিষ্কে এমনভাবে স্থায়ী রূপ নেয় যে, প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক পরিসরেও তা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রবেশ করে। ভাষাবিজ্ঞানীরা প্রায়ই কোড-সুইচিং (Code-switching) নিয়ে কথা বলেন— অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুযায়ী বক্তা বা লেখক ভাষার ধরন পরিবর্তন করতে পারেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় যখন সেই রূপান্তরের সক্ষমতা লোপ পায়। প্রাথমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষক এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধ্যাপকদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, বহু শিক্ষার্থী এখন পরীক্ষার খাতায়, অ্যাসাইনমেন্টে এমনকি চাকরির আবেদনপত্রেও অসচেতনভাবে বাংলিশ শব্দ বা চ্যাটিংয়ের শর্টকাট লিখে ফেলে।

চ্যাটিংয়ের শর্টকাট ভাষা প্রমিত বাংলা লেখার দক্ষতাকে মূলত তিনটি ক্ষেত্রে প্রভাবিত করতে পারে। প্রথমত, বানান ও যুক্তাক্ষরের ব্যবহার। দীর্ঘদিন রোমান হরফে বাংলা লেখার অভ্যাসে বাংলা লিপিতে নিয়মিত লেখার চর্চা কমে যেতে পারে। ফলে ণত্ব-ষত্ব বিধান, যুক্তাক্ষর এবং সঠিক বানান মনে রাখা কিছু শিক্ষার্থীর কাছে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত, যতিচিহ্ন ও বাক্যগঠন। চ্যাটিংয়ের অসম্পূর্ণ বাক্য ও সংক্ষিপ্ত অভিব্যক্তির অভ্যাস দীর্ঘ, সুসংবদ্ধ এবং যুক্তিনির্ভর বাক্য রচনার অনুশীলনে ঘাটতি তৈরি করতে পারে। তৃতীয়ত, শব্দভাণ্ডার ও ভাবপ্রকাশ। সাহিত্য, প্রবন্ধ ও সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস কমে গেলে সক্রিয় শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হওয়ার সুযোগও সীমিত হতে পারে। ফলে জটিল ভাবনা ও বিশ্লেষণ প্রকাশে উপযুক্ত শব্দ নির্বাচনে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। তাই প্রযুক্তিকে দোষারোপ না করে নিয়মিত বাংলা পড়া ও লেখার অভ্যাস গড়ে তোলাই জরুরি।

ভাষা কোনও স্থির পাথর নয়, এটি নদীর মতো প্রবহমান। ইংরেজি, ফারসি, আরবি ও পর্তুগিজ শব্দ আমাদের ভাষায় অবলীলায় মিশে গেছে এবং বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে। তাই নতুন প্রযুক্তিগত বাস্তবতায় ভাষার পরিবর্তনের ধারাকে সরাসরি ‘অপরাধ’ বা কেবল ‘অবক্ষয়’ আখ্যা দেওয়া সঠিক বিচার নয়। বাংলিশের উদ্ভবও হয়েছে প্রযুক্তির শুরুর দিকের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে— যখন মুঠোফোনে বাংলা কিবোর্ড সহজলভ্য ছিল না।

তবে পরিবর্তন এবং মৌলিক দক্ষতার ক্ষয় এক বিষয় নয়। একজন মানুষ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় কথ্য বা আঞ্চলিক ভাষা বলতেই পারেন, কিন্তু যখন তিনি কোনও দাপ্তরিক বৈঠক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবেদনে একই ভাষা ব্যবহার করবেন, তখন তা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক অযোগ্যতা হিসেবেই গণ্য হবে। সংকটটি চ্যাটিং নিয়ে নয়; সংকটটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক ভাষার সীমারেখা মুছে যাওয়া এবং গভীর ভাব প্রকাশের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলা।

রুশ চিন্তাবিদ লেভ ভাইগটস্কি দেখিয়েছেন, মানুষের চিন্তা ও ভাষার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। আমরা যে ভাষায় কথা বলি বা ভাবি, সেই ভাষার কাঠামো আমাদের চিন্তার পরিধি নির্ধারণ করে। যখন আমাদের ভাষা সংকুচিত হয়ে কেবল কয়েকটি সংকেত ও সংক্ষিপ্ত বাক্যাংশে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন অবচেতনভাবেই আমাদের চিন্তার গভীরতাও অগভীর হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।

একটি জটিল সমাজতাত্ত্বিক বিষয়, একটি গবেষণামূলক তথ্য বা একটি তীব্র অনুভূতির প্রকাশ কখনই ‘kno’, ‘hbe’ কিংবা তিনটি ইমোজি দিয়ে সম্পন্ন হতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট শব্দচয়ন, উপমা এবং সুসংগঠিত বাক্যকাঠামো। বার্তা আদান-প্রদানের ক্ষিপ্রতা যেন মানুষের গভীর ভাবনার অভ্যাসকে কেড়ে না নেয়, সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি।

প্রযুক্তির অগ্রগতি রোধ করা সম্ভব নয়, আর তা কাম্যও নয়। সমাধান রয়েছে সচেতন ভাষাচর্চায়। প্রথমত, অভ্র, গুগল জিবোর্ড বা রিদমিকের মতো বাংলা কিবোর্ড ব্যবহার করে দৈনন্দিন চ্যাটিংয়েও বাংলা লিপিতে লেখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যাকরণ শেখানোর পাশাপাশি অনুচ্ছেদ, সারাংশ, প্রতিবেদন, দাপ্তরিক পত্র ও প্রবন্ধ লেখার নিয়মিত অনুশীলন করাতে হবে। তৃতীয়ত, সাহিত্য, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও সংবাদপত্র পাঠের অভ্যাস ফিরিয়ে আনতে হবে, যা শব্দভাণ্ডার ও বাক্যগঠন সমৃদ্ধ করে। চতুর্থত, তরুণদের বুঝতে হবে যে সামাজিক মাধ্যমের ভাষা এবং পরীক্ষার খাতা, জীবনবৃত্তান্ত বা দাপ্তরিক লেখার ভাষা এক নয়। অনানুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক, উভয় ক্ষেত্রেই উপযুক্ত ভাষা ব্যবহারের দক্ষতাই প্রকৃত ভাষাদক্ষতা।

প্রযুক্তি ভাষা ব্যবহারের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ইন্টারনেটের সুবাদেই বাংলা আজ বৈশ্বিক পরিসরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, বাংলায় তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে। তাই প্রযুক্তিকে শত্রু ভাবার কোনও কারণ নেই। মূল লক্ষ্য বাংলিশকে নিষিদ্ধ করা কিংবা ইংরেজি বর্জন নয়; মূল লক্ষ্য হলো, আমরা যেন প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজ ভাষায় স্পষ্ট, যুক্তিপূর্ণ, নির্ভুল ও সাবলীলভাবে নিজেদের প্রকাশ করতে পারি।