দুর্গাপুজো বাংলার কাছে বরাবরই শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসবের চেয়ে অনেক বেশি কিছু। এটি শিল্প, সাহিত্য, সিনেমা, শৈশব, নস্টালজিয়া এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা আমাদের সমষ্টিগত স্মৃতির এক অনন্য উদ্যাপন। প্রতি শরতে কলকাতা যেন এক বিশাল সাংস্কৃতিক ক্যানভাসে পরিণত হয়, যেখানে শত শত থিম ও শিল্পভাবনার মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে।
তবে এ বছরের বহু থিমের মধ্যে কয়েকটি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে একটি অন্য কারণে। এগুলি শুধুমাত্র চোখধাঁধানো মণ্ডপ তৈরি করছে না; বরং আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেইসব মানুষ, চরিত্র ও গল্পের কাছে, যাঁরা বাঙালির জীবন ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছেন।
সুকিয়া স্ট্রিটের বৃন্দাবন মাতৃমন্দিরে কিংবদন্তি অভিনেতা সন্তোষ দত্তের জন্মশতবর্ষ স্মরণ করা হচ্ছে ‘শয়ে সন্তোষ’ থিমের মাধ্যমে। সকলের প্রিয় জটায়ু চরিত্রটি হয়ে উঠেছে অভিনেতার অসাধারণ অবদানকে নতুন করে স্মরণ করার এবং প্রিয় এই চরিত্রের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচিত করানোর এক সুন্দর মাধ্যম।
হাতিবাগানের নবীন পল্লিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে যোগীন্দ্রনাথ সরকারের ‘হাসি-খুশি’-র জগৎ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালি শিশুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে তাঁর ছড়া ও লেখাগুলি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে রয়েছে। দুর্গাপুজোর আবহে সেই প্রিয় জগৎকে ফিরিয়ে আনা তাই শুধুমাত্র একটি সৃজনশীল থিম নয়— এ যেন শৈশবের সেই নির্মল দিনগুলিতে ফিরে যাওয়া।
দক্ষিণ কলকাতায় সমাজসেবী পুজো শ্রদ্ধা জানাচ্ছে মহানায়ক উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে। বাঙালির কাছে উত্তমকুমার শুধু বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের প্রতীক নন। তাঁর পর্দার উপস্থিতি, অসংখ্য চরিত্র এবং চিরন্তন জনপ্রিয়তা বাংলার আবেগ ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
হালতু পূর্বাচল শক্তি সংঘ অমর কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে স্মরণ করা হচ্ছে ‘শরৎকথা’-র মাধ্যমে। প্রেম, সংগ্রাম, সমাজ এবং মানবসম্পর্ক নিয়ে শরৎচন্দ্রের গল্পগুলি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। উৎসবের আবহে তাঁর সাহিত্যজগৎকে তুলে ধরা বহু মানুষকে এমন এক সাহিত্যিককে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ করে দেয়, যাঁর
সৃষ্ট চরিত্রগুলি আজও বাঙালির কল্পনা ও স্মৃতিতে জীবন্ত।
হালতুর বটতলা রিক্রিয়েশন ক্লাবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে কিংবদন্তি কমিক্স স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথকে, ‘শতবর্ষে নারায়ণ দেবনাথ’-এর মাধ্যমে। হাঁদা-ভোঁদা, বাঁটুল দ্য গ্রেট এবং নন্টে-ফন্টে শুধুমাত্র কমিক্সের চরিত্র নয়; অগণিত বাঙালির কাছে তারা শৈশবের অমূল্য স্মৃতি। দুর্গাপুজোর মতো জনপরিসরে এই চরিত্রগুলির ফিরে আসা আমাদের মনে করিয়ে দেয় বাংলা কমিক্সের অসাধারণ সাংস্কৃতিক প্রভাবের কথা।
এই আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন ভিন্ন থিমগুলিকে যে সুন্দর ভাবনাটি একসূত্রে বেঁধেছে, তা হল—অতীতকে শুধু বইয়ের পাতা, পুরনো সিনেমা কিংবা ম্লান হয়ে আসা স্মৃতির মধ্যে আটকে থাকতে হবে না। শিল্প ও উৎসবের মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনা যায় জনমানসে।
দ্রুত পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রা এবং ডিজিটাল বিনোদনের এই যুগে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে আগের প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার দূরত্ব সহজেই বেড়ে যেতে পারে। দুর্গাপুজো তার বিপুল জনসম্পৃক্ততা ও সর্বজনীনতার মাধ্যমে সেই দূরত্ব কমিয়ে প্রজন্মের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে।
একটি মণ্ডপ হয়তো মাত্র কয়েক দিনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। একটি থিমও উৎসবের পর হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু যদি কোনও শিশু নারায়ণ দেবনাথ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠে, কোনও তরুণ শরৎচন্দ্রকে নতুন করে আবিষ্কার করে, কেউ উত্তমকুমারের একটি পুরনো সিনেমা আবার দেখতে চান, কেউ জটায়ু হিসেবে সন্তোষ দত্তকে নতুন করে মনে করেন, অথবা কেউ ‘হাসি-খুশি’-র জগৎকে নতুন করে চিনতে পারেন— তাহলে সেই প্রভাব অনেক দীর্ঘস্থায়ী হয়। সেই মুহূর্তেই হয়তো একটি পুজোর থিম শুধুমাত্র একটি থিমের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা হয়ে ওঠে বাংলার সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক জীবন্ত দলিল।
এই উদ্যোগগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দুর্গাপুজো শুধু বর্তমানকে উদ্যাপন করার উৎসব নয়; বরং সেইসব মানুষ, গল্প এবং শিল্প-ঐতিহ্যকেও স্মরণ করার সুযোগ, যাঁরা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এইভাবেই উৎসবটি অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এবং এক প্রজন্মের সঙ্গে অন্য প্রজন্মের মধ্যে একটি সেতু হয়ে উঠতে পারে।