শুদ্ধিকরণের নামে এখনও এসব কী?

PIC- AI

একটি জনসভা শেষ হওয়ার পর সেই সভাস্থল ‘শুদ্ধ’ করার জন্য আচার পালন— একবিংশ শতাব্দীর ভারতে এমন ঘটনা নিছক রাজনৈতিক বিরোধিতার ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে সমাজের বহু পুরনো এক মানসিকতা, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জাতপাত, অস্পৃশ্যতা এবং মানুষের মর্যাদাকে ছোট করার প্রবণতা। উত্তরাখণ্ডের হালদওয়ানিতে কংগ্রেস সভাপতি এবং রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়্গের জনসভাস্থলে এমনই একটি ‘শুদ্ধিকরণ’ অনুষ্ঠানকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।
গত ৮ আগস্ট হালদওয়ানির রামলীলা ময়দানে খাড়্গের জনসভা হয়েছিল। অভিযোগ, সভা শেষ হওয়ার পর সেখানে একটি সংগঠন বা কয়েকজন ব্যক্তি ‘শুদ্ধিকরণ’ আচার পালন করেন। ঘটনাটি নিয়ে ১৩ আগস্ট রাজ্যসভায় দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন খাড়্গে। তার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যসভার নেতা জগৎ প্রকাশ নাড্ডা তদন্তের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তিনি স্পষ্ট বলেছিলেন, বিজেপি কখনও এই ধরনের কাজ সমর্থন করে না এবং দোষীদের বিরুদ্ধে তদন্তের পরে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিন্তু খাড়্গের অভিযোগ, ঘটনার ২৪ দিন পরেও হালদওয়ানিতে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সেই কারণেই ২ সেপ্টেম্বর নাড্ডাকে চিঠি দিয়ে তিনি ফের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। প্রশ্নটি তাই এখন শুধু একটি রাজনৈতিক দলের অভিযোগ বা এক নেতার ব্যক্তিগত অপমানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন হল, প্রকাশ্য স্থানে এমন একটি কাজ ঘটলে প্রশাসনের ভূমিকা কী হবে?
কোনও ব্যক্তির রাজনৈতিক মতাদর্শ, দল বা পরিচয় নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। গণতন্ত্রে সেই মতভেদ স্বাভাবিক। কিন্তু কোনও ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয়েছেন বলে তাঁর উপস্থিতিকে ‘অশুচি’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং পরে সেই স্থান ‘শুদ্ধ’ করার চেষ্টা কোনও সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের লক্ষণ নয়। রাজনৈতিক বিরোধিতা যুক্তি, বক্তব্য, ভোট এবং সাংবিধানিক পদ্ধতিতে হওয়া উচিত; ধর্মীয় বা সামাজিক আচার ব্যবহার করে কোনও মানুষের মর্যাদা খর্ব করার মাধ্যমে নয়।
এই ঘটনায় ‘অস্পৃশ্যতা’র প্রসঙ্গটি তাই অপ্রাসঙ্গিক নয়। ভারতের সংবিধান স্পষ্টভাবে অস্পৃশ্যতা বিলোপ করেছে। স্বাধীনতার পর সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও যদি কোনও মানুষ বা তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ‘শুদ্ধ-অশুদ্ধ’র ধারণা প্রকাশ্যে ফিরে আসে, তবে তা আমাদের সামাজিক অগ্রগতির দাবিকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
এই প্রসঙ্গে ড. বি আর আম্বেদকরের ১৯২৭ সালের মহাড় সত্যাগ্রহের কথা মনে পড়ে। জল ব্যবহারের মতো একটি মৌলিক অধিকার থেকেও দলিত মানুষদের বঞ্চিত করা হয়েছিল। মহাড়ে আম্বেদকর যে সংগ্রাম করেছিলেন, তা কেবল একটি জলাধারে প্রবেশের অধিকার নিয়ে ছিল না; তার গভীরে ছিল মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি। সেই ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— ‘শুদ্ধ’ ও ‘অশুদ্ধ’র সামাজিক বিভাজন কোনও নিরীহ আচার নয়, তার সঙ্গে ক্ষমতা ও বৈষম্যের সম্পর্কও থাকতে পারে।
অবশ্যই, অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত। কারা এই আচার করেছিলেন, কেন করেছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অপরাধ ঘটেছে কি না— সবই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া দরকার। কিন্তু তদন্ত না করে বিষয়টিকে রাজনৈতিক বিতর্কের স্তরে আটকে রাখা উদ্বেগজনক।
রাজ্যসভায় দেওয়া আশ্বাসেরও একটি মূল্য আছে। কোনও ঘটনা নিয়ে সরকার বা শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব তদন্তের কথা বললে নাগরিকের স্বাভাবিক প্রত্যাশা থাকে, সেই তদন্ত বাস্তবে এগোবে। আইন সবার জন্য সমান—এই বিশ্বাসই গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি।
খাড়্গে একজন প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা। তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে অসম্মান করা হয়েছে কি না, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয় হল, কোনও নাগরিকের ক্ষেত্রেই যেন ‘অশুদ্ধ’ বলে তাকে বা তার উপস্থিতিকে চিহ্নিত করার সাহস না জন্মায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার অনেক গণতান্ত্রিক পথ আছে; কিন্তু অপমান, জাতপাতের মানসিকতা কিংবা কুসংস্কার তার কোনোটিই নয়।
হালদওয়ানির ঘটনায় তাই দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া জরুরি। কারণ বিষয়টি শুধু খাড়্গের নয়, কোনও একটি দলেরও নয়। এটি ভারতের সংবিধান যে সমতা, মর্যাদা এবং মানবিকতার কথা বলে, সেই
মূল্যবোধ রক্ষার প্রশ্ন।