গৌতম মণ্ডল
বিগত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থিরতার প্রেক্ষিতে কারণ হিসেবে যিনি ঘুরে ফিরে কেন্দ্রে বারবার উঠে আসছেন তিনি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আমেরিকার যে কোনও প্রেসিডেন্টই চূড়ান্তভাবে আধিপত্যবাদী কিন্তু এমন যুদ্ধ-উন্মাদ, মেগালোম্যনিয়াক এবং অসহিষ্ণুতার চূড়ান্ত প্রতিভূ প্রেসিডেন্ট এর আগে আমেরিকায় কখনও আসেনি। বিশ্বের অন্য প্রসঙ্গের কথা যদি বাদও দিই শুধুমাত্র বর্তমানে পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিপাত দিই তাহলে দেখব এর জন্য সম্যকভাবে একজন কেউ যদি দায়ী হন, তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের বিশ্বজুড়ে গুণ্ডামির কাজে যদি কেউ অনুঘটকের ভূমিকা নেন তিনি ইজরায়েলের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
ইরানকে আক্রমণের মধ্যে দিয়ে ট্রাম্প চেয়েছিলেন ইরানের তৈলভাণ্ডারের উপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব কায়েম। সেইসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আমেরিকার কাছে কোনোভাবেই বশ্যতা স্বীকার করেননি, সেটাও ছিল তাঁর না-পছন্দ। ওদিকে নেতানিয়াহু চাইছিলেন গাজাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দখল করতে। এ ব্যাপারে পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন খামেনি। এইজন্য ইরানকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া প্রয়োজন ছিল। যেহেতু মৌলবাদী দুঃশাসনে ক্লান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের জনগণের বড় একটা অংশ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিলেন সেজন্য ট্রাম্প ভেবেছিলেন খামেনি-সহ শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করলেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে ইরানি রেজিম।
এজন্য সিআইএ এবং মোসাদ দীর্ঘদিন ধরে খামেনির উপর নজরদারি চালাচ্ছিল। খামেনি-সহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের গোপন বৈঠকের খবর পেয়ে সুনির্দিষ্ট জায়গায় আমেরিকা ও ইজরায়েল ক্লাস্টার ব্লাস্টার বোম ফেলতে দেরি করেনি। ট্রাম্পের ধারণা ছিল খামেনির মৃত্যু হলে ইরানের খামেনি বিরোধী মুক্তমনের মানুষেরা রেজিম পরিবর্তন করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করবেন। আর এই হেজিমনির ভেতরে আমেরিকা একটা পুতুল সরকার বসিয়ে তেলের ভাণ্ডারের কর্তৃত্ব তো নেবেনই, পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার পুরোটাকেই তিনি করতলগত করে ফেলবেন। কিন্তু তা তো হলই না ইরান পূর্ণ বিক্রমে প্রায় একাই বিধ্বংসী আকার ধারণ করেছে। পশ্চিম এশিয়ার অন্যান্য দেশে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটির পাশাপাশি লাগাতার ব্যালেস্টিক মিসাইল ছুঁড়ে তেল আবিবকে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে ফেলেছে। নিজেও হয়েছে ধ্বংসস্তূপ। পুরো ব্যাপারটা অনুধাবন করার জন্য আমাদের আরও একটু পেছনে যেতে হবে। ট্রাম্পের প্রথম প্রেসিডেন্সির সময় (২০১৭–২০২১) পশ্চিম এশিয়া নীতিতে আমেরিকার অবস্থান নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে Joint Comprehensive Plan of Action থেকে সরিয়ে নেন, যার ফলে ইরানের ওপর পুনরায় কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। একই সময়ে তিনি জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করেন। এই সিদ্ধান্তগুলি ইজরায়েল সরকারের, বিশেষত নেতানিয়াহুর নীতির সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ও মিথোজীবিতার পরিচয় বহন করে।
নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইজরায়েলের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। তার মতে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি পশ্চিম এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে দিতে পারে। এটাকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের মধ্যে একটি শক্তিশালী কৌশলগত সমন্বয় তৈরি হয়, যাকে অনেকে ‘ট্রাম্প–নেতানিয়াহু অক্ষ’ বলেও উল্লেখ করেন। ইরানবিরোধীদর মতে, এই নীতির ফলেই পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা বেড়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছিল, আজ যুদ্ধের ষষ্ঠ দিন। অতর্কিত আক্রমণে আয়াতুল্লাহ খামেনি-সহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকের মৃত্যু হলেও এবং তেহরান সহ ইরানের অন্যত্র বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং কয়েক হাজার ইরানি মারা গেলেও, আশ্চর্যের বিষয়, ইরান রাষ্ট্র কিন্তু ভেঙে পড়েনি। বরং প্রতিরোধের ভাষা আরও কঠোর হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক বিপজ্জনক কৌশলগত হুমকি— হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে দেওয়ার উদ্যোগ।
এই পরিস্থিতি কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের ইঙ্গিত নয়; এটি ধীরে ধীরে বিশ্বরাজনীতির শক্তির ভারসাম্যকে বদলে দেওয়ার সম্ভাবনাও সুদৃঢ় করছে। এখন প্রশ্ন উঠছে— ইরান কতদিন যুদ্ধ চালাতে পারবে? বিশ্বশক্তিগুলিই বা কী ভূমিকা নেবে? আর ভারত, যার জ্বালানি নিরাপত্তার ৫০% পশ্চিম এশিয়া থেকে হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে আসে, কোন পথ বেছে নেবে?
ভয়াবহ আঘাতের পরেও ইরান কেন ভেঙে পড়ে না তা বোঝার জন্য তার রাষ্ট্রকাঠামো এবং রাজনৈতিক ইতিহাসকে বুঝতে হবে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর যে রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তা আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ধর্মীয় নেতৃত্বের এক বিশেষ সমন্বয়। রাষ্ট্রের নির্বাচিত সরকার থাকলেও চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার হাতে। এই কাঠামো শুধু রাজনৈতিক নয়, আদর্শিকও। ইরানের শক্তির আরেকটি উৎস তার সামরিক কাঠামো। নিয়মিত সেনাবাহিনীর পাশাপাশি রয়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC), যা শুধু সামরিক বাহিনী নয়; এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৌশলগত ক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তার অনেকাংশে এই বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে ইরানের নেতৃত্বের একটি অংশ নিহত হলেও রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়ে না। ইতিহাসে দেখা গেছে, বিপ্লবী রাষ্ট্রগুলিতে বাহ্যিক আক্রমণ প্রায়শই জাতীয়তাবোধকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। ইরানের ক্ষেত্রেও সেই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হয়ে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। কিন্তু আজ যখন রাষ্ট্র বিদেশি শক্তির আগ্রাসনের কাছে ক্রীড়নক হতে চলেছে তখন ইরানকে এই মুহূর্তে সবচাইতে কূটনৈতিকভাবে এগিয়ে রাখছে হরমুজ প্রণালী এবং ইরানের জনগণ।
বর্তমান সংকটকে মোকাবিলা করার জন্য ইরান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছে হরমুজ প্রণালী। পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির তেলের বিশাল অংশ এই পথ দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছয়। কিন্তু ইরান সরকার ঘোষণা করে দিয়েছে চিন এবং রাশিয়া ছাড়া আর কোনও দেশকেই তারা তেল নিয়ে যেতে দেবে না।
দু-একটি রাষ্ট্র জোরপূর্বক এই কাজ করতে গেলে তাদের জাহাজকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়ে ধ্বংস করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা তৈরি হলেই বিশ্ববাজারে তেলের দাম মুহূর্তে বেড়ে যাবে। ১৯৭৩ সালের তেল সংকটের মতো পরিস্থিতি আবার তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল আন্তর্জাতিক শক্তিগুলির অবস্থান। পশ্চিমা শক্তি— বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা— দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি অনুসরণ করে এলেও অন্যদিকে চিন ও রাশিয়া তুলনামূলকভাবে ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান নিয়েছে। তবে রাষ্ট্র হিসেবে সরাসরি কাউকে সেভাবে না পেলেও প্রক্সি ওয়ার করার মতো ইরানের পাশে বেশ কিছু গোষ্ঠী রয়েছে। যেমন হিজবুল্লাহ, হুথি, হামাসের মতো জঙ্গি সংগঠন।
ইরানের অর্থনীতি বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং সামাজিক অসন্তোষও রয়েছে। এই বাস্তবতা যুদ্ধ চালানোর ক্ষেত্রে বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। তবু ইরানের কয়েকটি শক্তি তাকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের ক্ষমতা দেয়। প্রথমত, তার ভূগোল। ইরানের বিশাল পাহাড়ি অঞ্চল আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন।
দ্বিতীয়ত, তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তি। গত দুই দশকে এই ক্ষেত্রে ইরান উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। পরমাণু বোমা তৈরি করার মতো জায়গায় তারা আছে কিনা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও এটুকু বলাই যায়, ইরানের হাতে বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম সুরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। আরও একটি বিষয়, ইসলামী বিপ্লবের আদর্শ ইরানের রাষ্ট্রকে একটি বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দেয়, যা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের মধ্যেও রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। এই কারণেই মনে করা যায়, ইরান সরাসরি বৃহৎ যুদ্ধ দীর্ঘদিন না করেও ‘অসম যুদ্ধ’ চালিয়ে যেতে পারে বহুদিন। এছাড়া ইরান আরও একটি মারাত্মক কূটনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেছে। সরাসরি আমেরিকাকে আক্রমণ করতে না পারলেও পশ্চিম এশিয়ার এগারোটি দেশ যেখানে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি রয়েছে সেগুলোকে তারা মিসাইল ও ড্রোন ছুঁড়ে ধ্বংস করেছে। এতে পরোক্ষভাবে আমেরিকার উপর যেমন আক্রমণ করা হল তেমনি অস্থিরতা ও সংকটকে আরও কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হল। এই সংকটের প্রেক্ষিতে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি আমদানিকারক দেশ, এবং পশ্চিম এশিয়ার তেলের উপর তার নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি। ইরান ভারতের কাছে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
চাবাহার বন্দর প্রকল্প ভারতের মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতকে বহুবার ইরান থেকে তেল আমদানি কমাতে হয়েছে।বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের সামনে তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, পশ্চিম এশিয়ায় বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ ভারতীয় নাগরিকের নিরাপত্তা। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা। ভারত সম্ভবত সরাসরি কোনও পক্ষ নেবে বলে মনে হয় না। বরং কূটনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে সংঘাত কমানোর পক্ষে অবস্থান নেবে।