পশ্চিম এশিয়ায় বর্তমান সংঘাত ভারতের কাছে নতুন কোনও বিষয় নয়, কিন্তু পরিস্থিতি এখন যে মাত্রায় জটিল হয়ে উঠেছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কারণ। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা, যুদ্ধবিরতির ভেঙে পড়ার আশঙ্কা এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলি ভারতের জ্বালানি ও সার সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির (সিসিএস) বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, দেশে আপাতত ডিজেল, পেট্রোল, ইউরিয়া এবং অন্যান্য সারের কোনও ঘাটতি নেই। সরকার বিকল্প উৎসের ব্যবস্থা করে রেখেছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত। এই আশ্বাস অবশ্যই স্বস্তিদায়ক, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— এই স্থিতি কতদিন বজায় রাখা সম্ভব? কারণ ভারতের জ্বালানি আমদানির একটি বড় অংশ পশ্চিম এশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যে পরিমাণ তেল পরিবহন হয়, তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ বন্ধ হলে শুধু ভারতের নয়, গোটা বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হবে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামগ্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অর্থাৎ, বিভিন্ন মন্ত্রক ও সংস্থা একযোগে কাজ করে সংকট মোকাবিলা করবে। এই ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ সম্ভব হয়। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করে বাস্তব প্রয়োগের ওপর। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, তথ্যের দ্রুত আদানপ্রদান এবং সংকটকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রবি মরসুমের জন্য সারের লভ্যতা। কৃষিনির্ভর ভারতের অর্থনীতিতে সারের ভূমিকা অপরিসীম। সরকার জানিয়েছে, আগামী রবি মরসুম পর্যন্ত পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। পাশাপাশি বিকল্প উৎসের কথাও ভাবা হচ্ছে। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, দীর্ঘমেয়াদে দেশকে সারের জন্য আমদানিনির্ভরতা কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো এবং মজবুত কৃষি পদ্ধতি গ্রহণ করা এখন বিশেষ জরুরি।
এই সংকটে ভারতীয় নাবিক ও প্রবাসীদের নিরাপত্তার প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিম এশিয়ায় এক কোটিরও বেশি ভারতীয় বাস করেন, যাঁদের একটি বড় অংশ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীতে কর্মরত। ইতিমধ্যে বহু ভারতীয় হতাহত হওয়ার খবর এসেছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের তরফে দ্রুত তথ্য সরবরাহ, জরুরি সহায়তা এবং কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও মানবিক পদক্ষেপ। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু কূটনৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক কর্তব্যও।
এছাড়া, এই বৈঠকে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর জোর দেওয়ার বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্বের দাবিদার। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভর। এই নির্ভরতা কমাতে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য অ-জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বর্তমান সংকট আসলে একটি সতর্কবার্তা— যদি এখনই বিকল্প শক্তির দিকে মনোযোগ না দেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে পড়তে হতে পারে।
তবে সবকিছুর মধ্যেও একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা যায় না— ভারতের অর্থনীতি এখনও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়বে। ফলে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল এই আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা।
সুতরাং বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের প্রস্তুতি আশাব্যঞ্জক হলেও আত্মতুষ্টির কোনও সুযোগ নেই। সংকট যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে। তাই প্রয়োজন দূরদর্শী পরিকল্পনা, বিকল্প উৎসের সন্ধান এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়াও জরুরি, যাতে সংঘাত দ্রুত মিটে যায় এবং বিশ্ব শান্তির পথে এগোতে পারে।
ভারতের জন্য এই সময়টি একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে তেমনই একটি সুযোগ— নিজের দুর্বলতাগুলি চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার সুযোগ।
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ও ভারতের প্রস্তুতি
পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ও ভারতের প্রস্তুতি PIC- AI