কল্যাণমূলক ব্যবস্থা

ভোরবেলা দেশের যে কোনও শহরে হাঁটলে এক অদৃশ্য সামাজিক কল্যাণব্যবস্থা চোখে পড়ে। অমৃতসরে স্বর্ণমন্দিরের সামনে বিশাল কড়াইয়ে লঙ্গরের রান্না চলছে। তিরুপতি মন্দিরে ভক্তরা নিঃশব্দে হুন্ডিতে টাকা ফেলছেন। এগুলোর কোনওটাই বাজেট বক্তৃতায় বিশেষ উল্লেখ পায় না, স্প্রেডশিটে ধরা পড়ে না। অথচ ভারতের বড় অংশের সামাজিক সুরক্ষা ঠিক এই অদৃশ্য ব্যবস্থার উপরেই দাঁড়িয়ে আছে।

অনেক দিন ধরে জনচর্চায় দান বা পরোপকারকে দেখা হয়েছে কর্পোরেট জগতের এক প্রসারিত হাত হিসেবে— সিএসআর (বাধ্যতামূলক সামাজিকদায়িত্ব) রিপোর্ট, বড় শিল্পপতিদের ফাউন্ডেশন বা প্রচারমুখী চেক হস্তান্তরের ছবি দিয়ে। কিন্তু এই ছবি অসম্পূর্ণ। ভারতের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে ছোট, নিয়মিত, নীরব কাজে। এক দোকানদার অপরিচিতের খাবারের বিল মিটিয়ে দিচ্ছেন।

কোনও পরিবার মন্দিরে রান্না করা ভাত পাঠাচ্ছে। কয়েকজন ছাত্র রবিবারে জল জমে থাকা গলি পরিষ্কার করছে। এগুলো নিছক প্রতীকী নয়— এগুলোই সামাজিক পরিকাঠামো।এই অভ্যাসের শিকড় প্রজাতন্ত্রের থেকেও প্রাচীন। হিন্দু ধর্মে ‘দান’, ইসলামে ‘যাকাত’, শিখ ধর্মে ‘সেবা’— এগুলি দানকে অনুগ্রহ নয়, কর্তব্য হিসেবে শেখায়। তাই এখানে ‘দাতা’ ও ‘সুবিধাভোগী’ শব্দদুটি অনেক সময় অচেনা শোনায়।


পাঞ্জাবের কৃষকরা যখন কমিউনিটি কিচেন চালান, সুরাটের ব্যবসায়ীরা বন্যার পর ত্রাণ সংগঠিত করেন, তখন তাঁরা প্রশংসা পাওয়ার জন্য করেন না; তাঁরা সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করেন। যেখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা অসম, প্রশাসন ধীর— সেখানে এই সামাজিক নেটওয়ার্কই ভরসা।

তবে বিশ্বাস ও নৈকট্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্যবস্থার শক্তির পাশাপাশি সীমাবদ্ধতাও আছে। কিছু বিষয় সহজেই সহানুভূতি উদ্রেক করে— যেমন ধর্মীয় রান্নাঘর, উৎসব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য, নগরীর গৃহহীন মানুষ, নিকাশি বা স্যানিটেশন— এসব কম দৃশ্যমান সমস্যা ততটা মনোযোগ আকর্ষণ করে না।

ট্র্যাফিক সিগন্যালে ভিক্ষুককে টাকা দেওয়া বিবেকের তাগিদে করা কাজ, কিন্তু তা স্থায়ী বাসস্থান, স্বাস্থ্যসেবা বা কর্মসংস্থানের বিকল্প নয়। বিপদ হলো, এই অপ্রাতিষ্ঠানিক উদারতা যেন প্রাতিষ্ঠানিক অবহেলার নৈতিক অজুহাত হয়ে না ওঠে।আধুনিক প্রযুক্তি এই চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ডিজিটাল পেমেন্ট, ক্রাউডফান্ডিং প্ল্যাটফর্ম, হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা— সব মিলিয়ে সাহায্য এখন মুহূর্তে পৌঁছে যায়। সম্প্রতি তামিলনাড়ুতে ঘূর্ণিজড় আঘাত হানার পর ইউপিআই লিঙ্কে ত্রাণের টাকা দ্রুত পৌঁছেছিল।

গতি অবশ্যই শক্তি। কিন্তু যখন সাহায্য এত সহজ হয়, তখন জবাবদিহির প্রশ্নও জটিল হয়ে যায়। অর্থ কোথায় গেল, কীভাবে খরচ হলো, এই নজরদারি প্রায়ই শিথিল হয়ে পড়ে।তাহলে মূল প্রশ্ন কি ভারতীয়রা যথেষ্ট দান করে কি না? উত্তর হলো, করে— প্রতিদিন, অভ্যাসবশত, অনেক সময় নিঃশব্দে। আসল প্রশ্ন হলো, এই বিপুল, বিকেন্দ্রীভূত উদারতাকে কীভাবে জননীতির সঙ্গে যুক্ত করা যায়। কীভাবে এই শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সমাধানের সঙ্গে সংযুক্ত করা সম্ভব?

ভাবা যেতে পারে, মুম্বাই বা পাটনার মতো শহরের পৌর সংস্থাগুলি যদি কমিউনিটি কিচেন, মন্দির বা মসজিদের ট্রাস্ট, স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠীগুলিকে অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ছোট ও নিয়মিত অনুদানকে চিহ্নিত করার সহজ পদ্ধতি থাকলে স্বচ্ছতা বাড়বে, আবার অতিরিক্ত কাগজপত্রের জটও তৈরি হবে না। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি একে অপরকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, সহযোগী হিসেবে দেখে, তাহলে কল্যাণমূলক ব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে।

ভারতের সমস্যা উদারতার অভাব নয়। সমস্যা হলো, এই উদারতাকে নীতিগত স্বীকৃতি ও কাঠামোর মধ্যে আনার অভাব। শিরোনাম কাঁপানো বড় অঙ্কের চেক নয়, প্রতিদিন অসংখ্য সাধারণ হাতের মধ্যে খাবার, সময় ও অর্থের আদানপ্রদানই আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য কল্যাণযন্ত্র। এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে, তাকে শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করার দিকেই এখন নজর দেওয়া জরুরি। তবেই সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত মানবিকতা এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব একসঙ্গে মিলিয়ে টেকসই কল্যাণের পথ তৈরি করতে পারবে।