আমরা লক্ষ্মীছাড়ার দল কাজী নজরুল ইসলাম

ফাইল চিত্র

তোমাদের বিষদাঁতের ছোবলে ছোবলে ধরণী জর্জরিত হয়ে উঠুক, তোমাদের অত্যুগ্র নিশ্বাসে নিশ্বাসে আকাশ তাম্রবর্ণ হয়ে উঠুক, বাতাসে বাতাসে জ্বালাদগ্ধ অগ্নি-দাহন হু-হু-হু-হু করে ছুটে যাক, তোমাদের কর্কশ পুচ্ছে জড়িয়ে বসুমতীর টুটি টিপে ধরো। তোমাদের বিষ জরজর পুচ্ছকে চাবুক করে হানো মারো এই মরা নিখিলবাসীর বুকে মুখে। বিষের রক্ত-জ্বালায় তারা মোচড় খেয়ে খেয়ে একবার শেষ আর্তনাদ করে উঠুক। খসে খসে পড়ুক তাদের রক্ত-মাংস- অস্থি তোমাদের বিষ-তিক্ত চাবুকের আঘাতে আঘাতে। গর্জন করো, গর্জন করো আমার হলাহলশিখ ভুজগ শিশুর দল ! বিপুল রোষে তোমরা একবার ফণা তুলে তোমাদের পুচ্ছের উপর ভর করে দাঁড়াও, বিশ্ব ছড়ায়ে উঠুক শুধু তোমাদের নিযুত কাল-ফশা। আকাশে-বাতাসে দুলুক শুধু তোমাদের নাগ-হিন্দোল। পাতালপুরের নিদ্রিত অগ্নিসিন্ধুতে ফুঁ দাও, ফুঁ দাও—ফুঁ দিয়ে জ্বালাও তাকে। আসুক নিখিল অগ্নিগিরির বিশ্ব-ধ্বংসী অগ্নিস্রাব, ভস্মস্তূপে পরিণত হোক এ-অরাজক বিশ্ব। ভগবান তার ভুল শোধরাক। এ খেয়ালের সৃষ্টিকে, অত্যাচারকে ধ্বংস করতে তোমাদের কোটি ফণা আস্ফালন করে ভগবানের সিংহাসন ঘিরে ফেলুক। জ্বালা দিয়ে জ্বালাও জ্বালাময় বিধি ও নিয়মকে।

এস আমার অগ্নি-নাগ-নাগিনীর দল! তোমাদের পলক-হারা রক্ত-চাওয়ার জাদুতে হিংস্র পশুর রক্ত হিম করে ফেলি, তোমাদের বিপুল নিশ্বাসের ভীম আকর্ষণে টেনে আনো ঐ পশুগুলোকে আমাদের অগ্নি-অজগরের বিপুল মুখগহ্বরে। আকাশে ছড়াও হলাহল-জ্বালা, নীল আকাশ-পাংশু হয়ে উঠুক! রবি-শশী-তারা গ্রহ-উপগ্রহ সব বিষ দাহনে নিবিড় কাল হয়ে উঠুক, বাতাস খুন-খারাবির রঙে রেঙে উঠুক। বিদ্যুতে-বিদ্যুতে তোমাদের অগ্নি-জিহ্বা লকলক করে নেচে উঠুক। ঢালো তোমাদের সঞ্চিত বিষ ঐ মহাসিন্ধু, নদনদীর বারি-রাশির মাঝে— টগবগ করে ফুটে উঠুক এই বিপুল জলরাশি- আর তার বুকে তোমাদের বিষ-বিন্দু বুদ্বুদ হয়ে ভেসে বেড়াক ৷
আজ ‘ভাসান’–উৎসবের দিন। মনসার পূজা-বেদীতে তোমাদের সঞ্চিত বিষ উদগীরণের আহ্বান এসেছে। এস— এই ধূমকেতু পুচ্ছের অযুত অগ্নি-নাগ-নাগিনীর মাঝে কে কোথায় আছ কোন্ বিবরের অন্ধকারে লুকিয়ে হে আমার পরম প্রিয় বিষধর কালফণীর দল ! এই অগ্নিনাগ—বাসে তোমাদেরও বিষ-চক্র-লাঞ্ছিত ফণা এসে মিলিত হোক, তোমাদের বিষ-নিশ্বাস-প্রশ্বাসে ধূমকেতু-ধুম আরো— আরো ধূমায়িত হয়ে উঠুক।
‘ঐ শোনো— শোনো
ঘন ঘন শন্ শন্
সাপ খেলাবার বাঁশি।”
মোরা সবাই স্বাধীন
মোরা সবাই রাজা

একবার শির উঁচু করে বল দেখি বীর, ‘মোরা সবাই স্বাধীন, সবাই রাজা!” দেখবে অমনি তোমার পূর্ব-পুরুষের রক্ত-মজ্জা-অস্থি দিয়ে-গড়া রক্ত-দেউল তাসের ঘরের মতো টুটে পড়েছে, তোমার চোখের সাতপুরু করে বাঁধা পর্দা খুলে গেছে, তিমির রাত্রি দিক-চক্রবালের আড়ালে গিয়ে লুকিয়েছে। তোমার হাতে-পায়ে গর্দানে বাঁধা শিকলে প্রচণ্ড মোচড় দিয়ে বলো দেখি বীর—‘মোরা সবাই স্বাধীন, সবাই রাজা !’ দেখবে অম্‌ন তোমার সকল শিকল সকল বাঁধন টুটে খানখান হয়ে গেছে ।


স্বরাজ মানে কি? স্বরাজ মানে, নিজেই রাজা বা সবাই রাজা ; আমি কারুর অধীন নই, আমরা কারুর সিংহাসন বা পতাকাতলে আসীন নই। এই বাণী যদি বুক ফুলিয়ে কোনো ভয়কে পরোয়া না করে মুক্ত কণ্ঠে বলতে পার, তবেই তোমরা স্বরাজ লাভ করবে, স্বাধীন হবে, নিজেকে নিজের রাজা করতে পারবে ; নইলে নয়।

কিন্তু আসল প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘আমার রাজা আমি— বাণী বলবার সাহস আছে কোন্ বিদ্রোহীর ? তার সোজা উত্তর— যে বীর কারুর অধীন নয়, বাইরে-ভিতরে যে কারুর দাস নয়, সম্পূর্ণ উদার মুক্ত! যার এমন কোনো গুরু বা বিধাতা নেই যাকে ভয় বা ভক্তি করে সে নিজের সত্যকে ফাঁকি দেয়, শুধু সে-ই সত্য স্বাধীন, মুক্ত স্বাধীন। এই অহম্ জ্ঞান আত্মজ্ঞান— অহঙ্কার নয়, এ হচ্ছে আপনার ওপর অটল বিরাট বিশ্বাস। এই আত্মবিশ্বাস না থাকলে মানুষ কাপুরুষ হয়ে যায়, ক্লীবত্ব প্রাপ্ত হয়। পরকে ভক্তি ক’রে বিশ্বাস করে শিক্ষা হয় পরাবলম্বন, আর পরাবলম্বন মানেই দাসত্ব। এই মনের পরাবলম্বন বা গোলামিই আমাদেরে চির-গোলাম করে রেখেছে। আমাদের তেত্রিশ কোটি লোকের তেত্রিশ কোটি দেবতা, অর্থাৎ আমাদের ভারতে তেত্রিশ কোটি মানুষের সকলেরই নির্ভরতা তাদের স্ব-স্ব দেরতার ওপর!

(ক্রমশ)