তারাপীঠ একটি ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্র। সারা বছরই এখানে পুণ্যার্থীদের আনাগোনা থাকে। বিশেষ তিথি ও উৎসবের সময় সেই ভিড় কয়েক গুণ বেড়ে যায়। সামনে কৌশিকী অমাবস্যা। সেই সময় কয়েক লক্ষ মানুষের সমাগম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে তারাপীঠের হোটেল, গেস্ট হাউস, লজ ও হোমস্টেগুলির নিরাপত্তা নিয়ে কোনও রকম ঢিলেমি রাখার অর্থই হল আরও বড় বিপদের সম্ভাবনা তৈরি করে রাখা।
অভিযোগ উঠেছে, মন্দির সংলগ্ন এলাকায় বছরের পর বছর ধরে বহু হোটেল ও অন্যান্য আবাসন অপরিকল্পিত ভাবে গড়ে উঠেছে। সরু রাস্তা, ঘনবসতি, পর্যাপ্ত খোলা জায়গার অভাব এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ত্রুটি—সব মিলিয়ে বড় অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় সিঁড়ি ও বারান্দা কার্যত অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় অতিথিদের অনেকে প্রাণ বাঁচাতে জানলা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করেছেন। কেউ কার্নিশ ধরে নেমেছেন, কেউ অন্য পথে পালানোর চেষ্টা করেছেন। এমন পরিস্থিতি থেকেই বোঝা যায়, জরুরি পরিস্থিতিতে একটি বহুতল হোটেলের নিরাপদ বহির্গমন ব্যবস্থা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
অগ্নিকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ হিসেবে শর্ট সার্কিটের কথা বলা হলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। কিন্তু আগুনের কারণ যাই হোক, প্রশ্নটি আরও বড়—একটি অগ্নিকাণ্ড ঘটলে অতিথিদের নিরাপদে বের করে আনার মতো পরিকাঠামো কি সংশ্লিষ্ট হোটেলগুলিতে রয়েছে? অভিযোগ অনুযায়ী কোথাও জরুরি দরজা বন্ধ, কোথাও বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারে বেরোনোর পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন। হোটেল কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সত্য-মিথ্যা তদন্তেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু অভিযোগ ওঠাটাই প্রশাসনের কাছে যথেষ্ট সতর্কবার্তা।
এই কারণেই তারাপীঠে প্রশাসনের নজরদারি হতে হবে নিয়মিত এবং কঠোর। অগ্নিকাণ্ডের পরে কিছু হোটেল বন্ধ করে দেওয়া নিঃসন্দেহে জরুরি পদক্ষেপ। কিন্তু শুধুমাত্র একটি দুর্ঘটনার পর সাময়িক অভিযান চালিয়ে দায় শেষ করা যাবে না। প্রতিটি হোটেল, গেস্ট হাউস ও হোমস্টের বৈদ্যুতিক সংযোগ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি সিঁড়ি, বিকল্প বহির্গমন পথ, ভবনের অনুমোদন এবং ধারণক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে। শুধু কাগজে অগ্নিনিরাপত্তার শংসাপত্র থাকলেই চলবে না; বাস্তবে সেই ব্যবস্থা কার্যকর কি না, তা পরীক্ষা করা দরকার।
বিশেষ করে পাঁচতলা বা তার বেশি উচ্চতার ভবনগুলির ক্ষেত্রে নিয়মিত মক ড্রিলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হোটেলের কর্মীদের আগুন লাগলে কী করতে হবে, কীভাবে অতিথিদের বের করে আনতে হবে, কোথায় জরুরি সরঞ্জাম রয়েছে— এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ থাকা আবশ্যক। অতিথিদেরও জরুরি বহির্গমন পথ সম্পর্কে জানানো উচিত। বহুতল ভবনে বিকল্প সিঁড়ি বা নিরাপদ বেরোনোর ব্যবস্থা কোনও বিলাসিতা নয়, জীবনরক্ষাকারী পরিকাঠামো।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, অপরিকল্পিত নির্মাণের প্রশ্নটি নতুন করে খতিয়ে দেখা। ধর্মীয় পর্যটনকেন্দ্র বলে নির্মাণের নিয়ম শিথিল করা যায় না। বরং যেখানে প্রতিদিন বিপুল মানুষের সমাগম হয়, সেখানে নির্মাণবিধি এবং অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম আরও কঠোর হওয়া উচিত। রাস্তা এমন হতে হবে যাতে জরুরি মুহূর্তে দমকলের গাড়ি দ্রুত পৌঁছতে পারে। দখলমুক্ত রাখতে হবে জরুরি পথ। ভবনের উচ্চতা, প্রবেশপথ, বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং অগ্নিনির্বাপণ পরিকাঠামো নিয়ে নিয়মিত পরিদর্শন আবশ্যক।
এই ঘটনার তদন্তও হতে হবে দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং দৃষ্টান্তমূলক। হোটেল কর্তৃপক্ষের কোনও গাফিলতি প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে যদি অনুমোদন দেওয়া বা নিরাপত্তা পরীক্ষার ক্ষেত্রে কোনও সরকারি আধিকারিকের গাফিলতি থাকে, তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। কারণ অগ্নিনিরাপত্তার নিয়ম ভাঙা কোনও সাধারণ প্রশাসনিক ত্রুটি নয়—তার মূল্য মানুষের জীবন দিয়ে দিতে হয়।
তারাপীঠে এই ন’টি মৃত্যু তাই শুধু শোকের ঘটনা নয়, প্রশাসনের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। ক্ষতিপূরণ দিয়ে পরিবারের ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। এখন প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যাতে আর কোনও পরিবারকে একই শোকের মুখোমুখি হতে না হয়। কৌশিকী অমাবস্যার আগে তারাপীঠের প্রতিটি আবাসনে পূর্ণাঙ্গ অগ্নিনিরাপত্তা অডিট করা হোক, অনিয়মযুক্ত প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হোক এবং নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ছাড় দেওয়া না হোক। ধর্মের শহরে পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও প্রশাসনের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব। এই অগ্নিকাণ্ড যেন সেই দায়িত্ব পালনের শেষ সতর্কবার্তা না হয়ে প্রথম কঠোর পদক্ষেপের সূচনা হয়।