উজ্জ্বলকুমার দত্ত
নিকট অতীতের যুদ্ধগুলোর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে, এক নিষ্ঠুর সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে এমন কিছু রাষ্ট্র আছে যারা নিজ ভূমিতে যুদ্ধ ডেকে আনে না; তারা যুদ্ধকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যায়। সেই নিরাপদ দূরত্ব অনেকক্ষেত্রে সাধারণ মিসাইলের নাগালের বাইরে প্রায় হাজার-হাজার কিলোমিটার দূরের কোন মাটি। ফলে মিসাইলের আঘাত ও বোমার উত্তাপে পুড়ে ছারখার হয় না তাদের নিজস্ব ভূখণ্ড। কেঁপে ওঠে না প্রশাসনিক অট্টালিকা। এমনকি আতঙ্কের ছায়া পড়ে না নাগরিক জীবনের উপর। যুদ্ধ সে সব দেশের কাছে এক ধরনের পরিকল্পিত রপ্তানিযোগ্য পণ্য। সহিংসতার এমন এক পণ্য যার মূল্য শোধ করে অন্য দেশের মানুষ। ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে তারা কেবল ফলাফল গোনে এবং দূর প্রান্তরে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় মানবতার দীর্ঘশ্বাস।
ইরাক ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ এই নির্মম সত্যকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। লক্ষ-লক্ষ মানুষের প্রাণ ঝরে গেছে সেখানে। রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে পড়েছে ধ্বংসস্তূপের নিচে। ইতিহাস লুণ্ঠিত হয়েছে। এই সর্বনাশের বিনিময়ে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো পেয়েছে সামরিক ঘাঁটি ও কৌশলগত সুবিধা। যুদ্ধের খাতায় হয়তো জয়ের হিসাব লেখা হয়েছে, কিন্তু মানবতার খাতায় জমা পড়েছে অপূরণীয় ক্ষতির দীর্ঘ ছায়া।
আজ সেই একই ছায়া নেমে আসছে পারস্যভূমিতে। ইরান ঘিরে যে যুদ্ধ-আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, তার নিয়ন্ত্রণ ক্রমশ রাজনীতিবিদদের হাত ছেড়ে সামরিক কাঠামোর দখলে চলে যাচ্ছে। যুদ্ধ যখন একক কমান্ডে থাকে, তখনও বা আলোচনার সম্ভাবনা থাকে; কিন্তু যখন তা বিভক্ত বাহিনী ও পৃথক-পৃথক কমান্ডের হাতে ছড়িয়ে পড়ে, তখন যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী ও নিষ্ঠুর হয়। এখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ, অথচ শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো আবার দূরত্বের দীর্ঘ নিরাপত্তায় বলয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বিশ্বকে গণতন্ত্রের পাঠ শেখায়।
এই বৈশ্বিক সহিংসতার আবহে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। বাস্তবে কোন শক্তি দীর্ঘদিন টিকে থাকে— অস্ত্রের, না জ্ঞানের। বিশ্ব মানচিত্রে আয়তনের দিক থেকে অতিক্ষুদ্র একটি দেশ ইজরায়েল।
ইজরায়েল শুরু থেকেই শিক্ষা ও গবেষণাকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখেছে। তাদের কাছে বিজ্ঞান শিক্ষা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার প্রাথমিক শর্ত। স্কুলস্তর থেকেই সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রশ্ন করা শেখানো হয। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার ও শিল্পক্ষেত্রের মধ্যে সরাসরি সংযোগ গড়ে তোলা হয়েছে। গবেষণার ফল দ্রুত প্রযুক্তিতে রূপ নেয় সেখানে। রাষ্ট্র সেই গবেষণার জন্য অর্থ দেয়, সময় দেয় এবং সর্বোপরি কাজ করার স্বাধীনতা দেয়। ফলে সাইবার সিকিউরিটি, চিকিৎসা প্রযুক্তি, কৃষি ও প্রতিরক্ষায় তারা বৈশ্বিক মান তৈরি করতে পেরেছে।
অন্যদিকে, ভারত মেধার অভাবে পিছিয়ে নেই। পিছিয়ে আছে অব্যবস্থার কারণে। ভারতবর্ষে শিক্ষা এখনও নম্বর ও পরীক্ষার জালে বন্দী। স্কুল ও কলেজে প্রশ্ন করার চেয়ে মুখস্থ করার চর্চা বেশি। গবেষণার চেয়ে এন্ট্রান্স পরীক্ষার গুরুত্ব বেশি। মেধাবী ছাত্রদের বড় অংশই পরীক্ষার দৌড়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ও পরিকাঠামো গড়ে ওঠে না। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা প্রায়ই অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন। ফলে বহু মেধা বিদেশমুখী হয়। ব্রেনড্রেনের মতো অবস্থা তৈরি হয়। অর্থাৎ দেশের ভেতরে বৈশ্বিক মানের বিজ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি হয় না। বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ আমাদের ভারত— যেখানে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবসম্পদের ভান্ডার অফুরন্ত। কিন্তু আমরা এখনও অতীতের গৌরবগাথা আঁকড়ে ধরে বর্তমানকে অবহেলা করছি। ধর্মগ্রন্থের পাতায় আধুনিক বিজ্ঞানের সূত্র খুঁজে আত্মতৃপ্তি অনুভব করছি। কিন্তু নতুন বিজ্ঞানী, গবেষণা, প্রযুক্তি গড়ে তোলার পরিবেশ তৈরি করতে পারছি না। বিজ্ঞান বিশ্বাসে চলে না। বিজ্ঞান চলে সংশয়, পরীক্ষা ও প্রমাণের পথ ধরে। সেই পথ থেকেই আমরা ক্রমশ একটু-একটু করে দূরে সরে যাচ্ছি।
এই সংকটের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় আমাদের স্কুল-শিক্ষা ব্যবস্থায়, বিশেষ করে বিজ্ঞান শাখায়। ক্লাস ইলেভেন ও টুয়েলভে পৌঁছতেই ছাত্রছাত্রীরা বিজ্ঞানের মৌলিক সৌন্দর্য, হাতে–কলমে শেখা ও যুক্তিবোধের চর্চাকে প্রায় সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইঞ্জিনিয়ারিং ও মেডিক্যাল এন্ট্রান্স পরীক্ষার দৌড়ে নেমে পড়ে। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা কোচিং সেন্টারের দিকে তারা ছুটে যায়, যেখানে পরীক্ষায় পাশ করানোর কৌশল শেখানো হয়, কিন্তু বিজ্ঞান শেখানো হয় না।
ফলে ইলেভেন–টুয়েলভের স্কুলগুলো ধীরে-ধীরে নীরব দর্শকে পরিণত হয়। কোন ছাত্রের মেধা কোথায়, তাকে কীভাবে উৎসাহ দিলে সে ভবিষ্যতে ভালো বিজ্ঞানী বা গবেষক হতে পারে— এই প্রশ্নগুলো প্রায় অনুপস্থিত। শহরের অধিকাংশ প্রাইভেট স্কুলনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমে টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে, যেখানে শিক্ষা ব্যবসা ও মেধা একটি ব্যবহারযোগ্য পণ্য মাত্র। শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ এমনভাবে কলুষিত হয়েছে যে, সাধারণ জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক কৌতূহলটুকুও ছাত্ররা আর স্কুল থেকে অর্জন করতে পারছে না। এক দুটি ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকতে পারে কিন্তু সেগুলি থেকে বৃহৎ পরিসরে দেশের কোন লাভ হয় না।
এর ফল ভয়াবহ। অযথা অসংখ্য তরুণ বারবার এন্ট্রান্স পরীক্ষার চক্রে আটকে সময় ও অর্থ অপচয় করছে। কোচিং সেন্টারগুলি জানে, সবাই সফল হবে না, তবুও সবাইকে ভর্তি করিয়ে দেশের সম্পদ নষ্ট করা হচ্ছে। এমনকি মেধা তালিকার প্রথম সারির ছাত্ররাও ভবিষ্যতের বিস্তৃত পথে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। এই ‘একটি পরীক্ষা পাশ করার অসাধু স্ট্র্যাটেজি’ ধীরে ধীরে মানুষের মস্তিষ্ককে হ্যাক করে নিচ্ছে। ফলে প্রকৃত গবেষণামুখী মনন তৈরি হওয়ার আগেই তা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
ফলত, বৃহৎ জনঅরণ্য থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে আমাদের অন্য দেশের উপর নির্ভর করতে হয়। গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে বৈশ্বিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে গভীর মেধাচর্চা, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও স্বাধীন চিন্তার পরিবেশ থাকা দরকার, তা এই পরীক্ষানির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমাগত ধ্বংস করে দিচ্ছে।
যুদ্ধ যেমন সভ্যতাকে ধ্বংস করে; তেমনই ভুল শিক্ষা ব্যবস্থা ভবিষ্যৎকে ধ্বংস করে। একদিকে দূরদেশে রপ্তানিকৃত যুদ্ধ মানবতাকে ক্ষতবিক্ষত করছে, অন্যদিকে নিজেদের ঘরের ভেতরেই আমরা জ্ঞানের ভিত্তি দুর্বল করে ফেলছি। এই দুই সংকট একসূত্রে বাঁধা— কারণ শক্তির রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জ্ঞানহীন সমাজকেই সবচেয়ে বেশি আঘাত করে।
যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই— এই আকাঙ্ক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই জরুরি জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা। ধর্মকে তার মর্যাদার জায়গায় রেখে, বিজ্ঞানকে তার নিজের নিয়মে চলতে দিলে তবেই একটি সমাজ সত্যিকারের শক্তিশালী হয়। নচেৎ আমরা অতীতের গৌরবগাথা আওড়াতে-আওড়াতে নিজেদের ভবিষ্যৎটাকেই হারিয়ে ফেলব। এভাবে যা কিছু অর্জন বা বিসর্জন হোক না কেন, ইতিহাস কিন্তু আমাদের ক্ষমা করবে না।