চাই বিকল্প জ্বালানি

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ বা সামরিক উত্তেজনা ভারতের সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, সাম্প্রতিক এলপিজি (LPG) সংকট তারই এক স্পষ্ট উদাহরণ। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ইজরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র বিনিময় হলেও তার অভিঘাত এসে পড়ে ভারতের ঘরের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাস্তার ধারের খাবারের দোকান পর্যন্ত। এই বাস্তবতা আমাদের আবার মনে করিয়ে দেয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি নির্ভরতার জালে আমরা কতটা জড়িয়ে আছি।

সম্প্রতি এলপিজি সরবরাহে ঘাটতির ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় কালোবাজারি শুরু হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু জরুরি পদক্ষেপের ফলে গৃহস্থালির এলপিজি সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু বাণিজ্যিক এলপিজির সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। আর এখানেই সমস্যার মূল।

দেশজুড়ে লক্ষ লক্ষ ছোট খাবারের দোকান, মাঝারি মানের রেস্তোরাঁ, হোটেল কিংবা ক্লাব— সবকিছুর মূল চালিকাশক্তি এই বাণিজ্যিক এলপিজি। যাঁরা নিজের শহর থেকে দূরে অন্য শহরে কাজ বা পড়াশোনা করেন, তাঁদের জন্য এই খাবারের দোকানগুলিই একমাত্র ভরসা। ফলে এলপিজি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটলে শুধু ব্যবসায়ীদেরই নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।


সরকার ইতিমধ্যেই বাণিজ্যিক এলপিজির কোটা ২০ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা করেছে এবং বিদেশ থেকে এলপিজি আমদানিও জোরদার করা হয়েছে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে গ্যাসবাহী জাহাজ এসে পৌঁছেছে। এগুলি নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই ধরনের সাময়িক ব্যবস্থা দিয়ে কি দীর্ঘদিনের জন্য সমাধান সম্ভব?

বাস্তবতা হল, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিরতা যতদিন চলবে, ততদিন জ্বালানি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। ভারত এখনও বড় অংশে জ্বালানির জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সামান্য পরিবর্তনও আমাদের বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। এই নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন।এই পরিস্থিতিতে বিকল্প জ্বালানির দিকে দ্রুত এগোনো ছাড়া আর কোনও পথ নেই। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের ছোট ও মাঝারি ব্যবসাগুলিকে ধীরে ধীরে পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস (PNG), বৈদ্যুতিক ইন্ডাকশন বা বায়োফুয়েলের মতো বিকল্প ব্যবস্থায় নিয়ে আসা জরুরি।

এতে শুধু জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যময় হবে না, বরং পরিবেশের ওপর চাপও কমবে।পিএনজি ব্যবস্থার একটি বড় সুবিধা হল— এটি সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা যায়, ফলে সিলিন্ডারের উপর নির্ভরতা কমে। এছাড়া মিথেন গ্যাস, যা পিএনজির প্রধান উপাদান, তা বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র বা কয়লাখনি থেকে উৎপাদন করা সম্ভব। যদি পৌর সংস্থাগুলি এই ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসে, তবে একদিকে যেমন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে, তেমনি জ্বালানি উৎপাদনের নতুন দিগন্তও খুলবে।

তবে এই পরিবর্তন সহজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন বড় মাপের বিনিয়োগ, পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং কার্যকর বিতরণ ব্যবস্থা। বিশেষ করে ‘লাস্ট মাইল ডেলিভারি’ বা শেষ ধাপের সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। সরকার যদি পরিকল্পিতভাবে এই খাতে বিনিয়োগ করে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করে, তাহলে ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল ও স্বনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

সবশেষে, এই সংকট আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়— একটি দেশ তখনই প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, যখন তার মৌলিক চাহিদাগুলি নিজেরাই মেটাতে পারে। খাদ্য, পরিবহন, স্বাস্থ্য ও জ্বালানির মতো ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জন না করলে বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়া কঠিন। অতএব, বর্তমান এলপিজি সংকটকে শুধু একটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই যদি আমরা বিকল্প জ্বালানি, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বনির্ভরতার পথে এগিয়ে না যাই, তবে আগামী দিনে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।