দেবপ্রিয় বাগচী
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হয়ে উঠছে— এটি কেবল ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, এটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার এক কঠিন পরীক্ষা। ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতি নামক এক আপাত-প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার সম্ভাবনা এই নির্বাচনকে ঘিরে এক গভীর সংশয় তৈরি করেছে। প্রশ্নটি সরল— এটি কি ভোটার তালিকার স্বাভাবিক সংশোধন, নাকি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রকল্প?
প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটারকে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’-র আওতায় আনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য অনুযায়ী, এঁদের মধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ২৭ লক্ষ, চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারেন। ইতিমধ্যেই বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর মাধ্যমে ৬১.৮ লক্ষ নাম বাদ পড়েছিল। নতুন করে এই ছাঁটাই যুক্ত হলে মোট সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে ৭৬.২ লক্ষে।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার হারানো নিছক একটি প্রশাসনিক ঘটনা নয়, এটি নির্বাচনী গণতন্ত্রের অন্তঃসারকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে করিয়ে দিয়েছে। কারণ একটি নির্বাচন তখনই অর্থবহ, যখন তা সর্বাধিক অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।
প্রথম পর্যায়ের ১৫২টি আসনে প্রায় ৩২ লক্ষ ‘ডিসক্রিপ্যান্সি’-চিহ্নিত ভোটারের মধ্যে আনুমানিক ৪৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১৪.৪ লক্ষ, এই নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন না। কারণ, ভোটার তালিকা ইতিমধ্যেই ‘ফ্রিজ’ হয়ে গিয়েছে। এই ‘ফ্রিজ’ হওয়ার মুহূর্তটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর পর আর কোনও সংশোধনের সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ, আপিল প্রক্রিয়া চললেও, সেই ফলাফল বর্তমান নির্বাচনে কোনও প্রভাব ফেলবে না। এটি কার্যত একটি সাংবিধানিক অধিকারকে সময়সীমার অজুহাতে স্থগিত রাখা।
এই পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অস্পষ্ট ধারণা— ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সি’। নির্বাচন কমিশন স্পষ্টভাবে জানায়নি, কোন কোন মানদণ্ডে একজন ভোটার এই শ্রেণিতে পড়ছেন। নামের বানানে সামান্য অমিল, ঠিকানার পরিবর্তন বা ভাষাগত বৈচিত্র— এসব কি যথেষ্ট কারণ?
একটি রাজ্য যেখানে বাংলা, হিন্দি, উর্দু, সাঁওতালি-সহ একাধিক ভাষা ব্যবহৃত হয়, সেখানে বানান বা উচ্চারণের ভিন্নতা খুবই স্বাভাবিক। সেই ভিন্নতাকে যদি সন্দেহের ভিত্তি করা হয়, তবে তা একটি কাঠামোগত বৈষম্যের জন্ম দেয়।
মুর্শিদাবাদ ও মালদহ এই দুটি মুসলিম-অধ্যুষিত জেলায় সর্বাধিক সংখ্যক ভোটার এই প্রক্রিয়ার আওতায় পড়েছেন। এই তথ্যটি নিছক কাকতালীয় বলে মনে করা কঠিন। কারণ, যদি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা অঞ্চলের উপর এই প্রভাব বেশি পড়ে, তবে তা নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করবে।
এই প্রেক্ষাপটে, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে— তারা বিজেপি তথা কেন্দ্র সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে— তা নতুন নয়। অতীতেও একাধিকবার এই অভিযোগ সামনে এসেছে।
নির্বাচন কমিশন দাবি করছে যে, পুরো প্রক্রিয়াটি বিচার বিভাগীয় আধিকারিকদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু আপিলের জন্য গঠিত ১৯টি ট্রাইব্যুনাল কাজ করবে বলে জানালেও সুপ্রিম কোর্ট কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়নি। ফলে, যাঁরা প্রথম স্তরের সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট, তাঁদের সামনে কার্যকর প্রতিকার ব্যবস্থা কার্যত অনুপস্থিত। এই পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগীয় তত্ত্বাবধান একটি ‘প্রতীকী আশ্বাস’-এর বেশি কিছু হয়ে উঠতে পারছে না।
ডিজিটালি স্বাক্ষরিত আদেশ আপলোডে বিলম্ব, এই কারণ দেখিয়ে প্রক্রিয়ার বিলম্ব ব্যাখ্যা করেছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু এই ব্যাখ্যায় প্রশ্ন ওঠে, এত বড় একটি প্রক্রিয়া শুরু করার আগে কি যথেষ্ট প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল? যদি না নেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা প্রশাসনিক অদক্ষতা। আর যদি নেওয়া হয়ে থাকে, তবুও এই ব্যর্থতা ঘটে, তবে তা আরও গুরুতর— কারণ তা প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
আইনগতভাবে নির্বাচন কমিশন হয়তো নিজেদের সঠিক প্রমাণ করতে পারবে। কিন্তু গণতন্ত্র কেবল আইনের শাসন নয়— এটি ন্যায়, অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার উপর দাঁড়িয়ে থাকে।
যখন লক্ষ লক্ষ মানুষ একটি অস্পষ্ট প্রক্রিয়ার ফলে ভোটাধিকার হারান, তখন সেই প্রক্রিয়া আইনি হলেও নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
সুপ্রিম কোর্ট ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে, কিন্তু কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা দেয়নি। এটি বিচার বিভাগের স্বাভাবিক সংযমের উদাহরণ হলেও, নির্বাচনী সময়সীমার সঙ্গে এই সংযম এক ধরনের বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি করছে।
কারণ, নির্বাচনের আগে দ্রুত প্রতিকার না হলে, সেই বিচার কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়—ভারতের নির্বাচন কমিশন কি এখনও সেই নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, যা একসময় বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত ছিল? নাকি তা ক্রমশ রাজনৈতিক প্রভাবের অধীন হয়ে পড়ছে? যদি দ্বিতীয়টি সত্য হয়, তবে তা কেবল একটি নির্বাচনের সমস্যা নয়; এটি গণতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের কারণ।
শেষ কথা: নীরবতা নয়, জবাবদিহি চাই৷
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল জবাবদিহি। নির্বাচন কমিশনকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—
১) ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’-র সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড কী। ২) কেন নির্দিষ্ট অঞ্চল বা সম্প্রদায় বেশি প্রভাবিত। ৩) কেন আপিল প্রক্রিয়া কার্যকর হতে দেরি হচ্ছে।
গণতন্ত্রে আস্থা তৈরি হয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে। সেই আস্থা যদি ভেঙে পড়ে, তবে নির্বাচন কেবল একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়, যার ফলাফল থাকলেও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকে না।