ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলা, প্রকৃতির সামনে অসহায় মানুষ : প্রস্তুতির শিক্ষা

ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ ভূমিকম্প আবার আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল— প্রকৃতির সামনে মানুষের অসহায়তা কতটা গভীর। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে রাজধানী কারাকাস ও আশপাশের অঞ্চল বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শত শত মানুষের মৃত্যু, হাজার হাজার মানুষ আহত, আর অসংখ্য বাড়িঘর মুহূর্তে ধুলোয় মিশে যাওয়া— এই চিত্র নতুন নয়, কিন্তু প্রতিবারই তা আমাদের অপ্রস্তুত অবস্থার নির্মম স্মারক হয়ে ওঠে।

ভেনেজুয়েলার ভূতাত্ত্বিক অবস্থান এমন যে, সেখানে সাধারণত এত বড় ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যায় না। তবু এই ঘটনা প্রমাণ করে– ভূমিকম্প কখন, কোথায়, কীভাবে আঘাত হানবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধরনের ‘ডাবলেট’ বা যুগ্ম ভূমিকম্পে একটির সঙ্গে অন্যটির জটিল সম্পর্ক থাকে, ফলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে যখন ভূমিকম্পের গভীরতা কম হয়, তখন তার অভিঘাত সরাসরি ভূমির ওপর এসে পড়ে এবং ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই পরিস্থিতিতে প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো উদ্ধার ও ত্রাণ। আহতদের চিকিৎসা, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার, খাদ্য ও পানীয়ের ব্যবস্থা— এসবই এখন ভেনেজুয়েলার প্রধান প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক সাহায্য, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলির তরফ থেকেও সহমর্মিতার হাত বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানবিকতার দিক থেকে এ এক বৈশ্বিক দায়িত্ব। উল্লেখ্য, ভারত ছয় টন চিকিৎসা সামগ্রী-সহ বিশেষ প্যারাট্রুপার মেডিক্যাল টিম পাঠিয়েছে।


তবে এর পাশাপাশি আরও বড় একটি প্রশ্ন সামনে আসে— আমরা কি এই ধরনের বিপর্যয়ের জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত? এই প্রশ্ন শুধু ভেনেজুয়েলার জন্য নয়, ভারতের মতো দেশগুলির জন্যও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমাদের দেশের একটি বড় অংশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে হিমালয় সংলগ্ন এলাকাগুলি উচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবু বাস্তবে দেখা যায়, নির্মাণকাজে নিরাপত্তার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।

ভারতে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে। সেই গবেষণায় দেখা গিয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে আমরা যে মানদণ্ডে ভবন তৈরি করি, তা প্রকৃত ঝুঁকির তুলনায় কম। অথচ এই তথ্য সামনে আসার পরও তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে নানা প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক বাধা সামনে আসে। বড় বড় পরিকাঠামো প্রকল্পে অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কা দেখিয়ে অনেক সময় এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের প্রাণের মূল্য কি তার চেয়েও কম?

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাধারণ মানুষের বাসস্থান। পরিসংখ্যান বলছে, ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ছোট, একতলা বা দোতলা বাড়িতে। কারণ এই বাড়িগুলির বেশিরভাগই কোনও নিয়ম মেনে তৈরি হয় না। গ্রামাঞ্চল বা শহরের বস্তি এলাকায় এই সমস্যা আরও প্রকট। সেখানে নির্মাণে কোনও প্রকৌশলগত পরিকল্পনা থাকে না, ফলে সামান্য কম্পনেও বাড়ি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের ভাবতে হবে— প্রস্তুতি বলতে আমরা কী বুঝি? শুধু উন্নত প্রযুক্তি বা বড় বড় প্রকল্প নয়, বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, নিরাপদ নির্মাণ পদ্ধতি প্রচার করা এবং কঠোরভাবে নির্মাণ বিধি প্রয়োগ করাই সবচেয়ে জরুরি। স্কুল, হাসপাতাল, আবাসন— সব ক্ষেত্রেই ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

এছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে আরও দক্ষ করে তুলতে হবে। দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য প্রশিক্ষিত দল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং পরিষ্কার পরিকল্পনা থাকা দরকার। নিয়মিত মহড়া এবং জনসচেতনতা কর্মসূচিও এই প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। আমরা প্রায়ই ভাবি— ‘এখানে তো এমন কিছু হয় না।’ কিন্তু প্রকৃতি সেই ভাবনাকে মুহূর্তে ভুল প্রমাণ করতে পারে। ভেনেজুয়েলার ঘটনাই তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তাই বিপর্যয় আসার আগে প্রস্তুত হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

শেষ পর্যন্ত সত্যিটা খুবই সহজ— ভূমিকম্প থামানো আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তার ক্ষতি কতটা কমানো যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে আমাদের প্রস্তুতির ওপর। সঠিক পরিকল্পনা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানবিক উদ্যোগ— এই তিনের সমন্বয়ই পারে ভবিষ্যতের বিপর্যয়কে অনেকটা সহনীয় করে তুলতে।

প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে চলবে। আমাদের কাজ হলো সেই নিয়মকে সম্মান জানিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত রাখা। প্রস্তুতি নেই, আর বিপর্যয় এলো— এই পুরনো চক্র থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই।