শ্রাবণ এলেই বাঙালির মন অকারণে ভারী হয়ে ওঠে। মেঘলা আকাশের নীচে, বৃষ্টিভেজা বিকেলের নির্জনতায়, কোথা থেকে যেন ভেসে আসে এক অনিবার্য শূন্যতার সুর। এই শ্রাবণই তো কেড়ে নিয়েছে রবীন্দ্রনাথকে, নজরুলকে, আর সেই সঙ্গে একদিন নিভিয়ে দিয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রকে। ২৪ জুলাই, ১৯৮০— এই দিনটিতে থেমে গিয়েছিল এক জীবনের চলমান মহাকাব্য। তবু কি সত্যিই থেমেছে? চার দশক পেরিয়ে, আজও কি তিনি আমাদের ছেড়ে গিয়েছেন?
উত্তমকুমার— এই নামটি উচ্চারণ করলেই যেন ভেতরে কোথাও আলোর একটি পর্দা জ্বলে ওঠে। সেই পর্দায় একের পর এক দৃশ্য ভেসে ওঠে— কখনও ‘হারানো সুর’-এর মায়া, কখনও
‘নায়ক’-এর গভীর আত্মজিজ্ঞাসা, কখনও বা ‘সপ্তপদী’-র প্রেমের অনন্ত যাত্রা। তিনি যেন কেবল অভিনেতা নন, তিনি এক হৃদয়স্পর্শী শৈল্পিক ব্যক্তিত্ব, এক অনিবার্য আবেগ, যা বাঙালির অস্তিত্বের ভেতরে গেঁথে আছে।
৩ সেপ্টেম্বর, ১৯২৬। বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছিলেন এক সাধারণ ছেলে, যিনি একদিন হয়ে উঠলেন অসামান্যতার প্রতীক। প্রথম জীবন তাঁর মোটেই রূপকথার মতো ছিল না। সংসারের টানাপোড়েন, অভাবের চাপ, সবই ছিল তাঁর সঙ্গী। পড়াশোনা শেষ হওয়ার আগেই জীবিকার খোঁজে নামতে হয়েছিল। কলকাতা পোর্ট ট্রাস্টের এক সাধারণ কেরানি, সেই পরিচয়েই শুরু তাঁর জীবনযুদ্ধ। অথচ সেই কেরানির ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক ভবিষ্যৎ মহানায়ক।
অফিসের কাজের ফাঁকে, আহিরীটোলার ‘সুহৃদ সমাজ’-এর মঞ্চে অভিনয় করতে করতে তিনি যেন নিজের ভিত গড়ে তুলছিলেন। থিয়েটারের আলো-ছায়ার ভেতরেই জন্ম নিচ্ছিল তাঁর শিল্পীসত্তা। সেই মঞ্চই একদিন তাঁকে পৌঁছে দিল স্টুডিয়োপাড়ায়। ১৯৪৮ সালে ‘দৃষ্টিদান’ তাঁর প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয়। কিন্তু সাফল্য তখনও বহু দূর। বরং একের পর এক ব্যর্থতা তাঁকে ঘিরে ধরল। ‘ফ্লপ মাস্টার’— এই তকমা নিয়েই তাঁকে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছিল দীর্ঘ চার বছর।
কিন্তু শিল্পীর প্রকৃত শক্তি তো এখানেই, হাল না ছেড়ে এগিয়ে চলা। ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ যেন তাঁর জীবনে প্রথম সূর্যোদয়। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক চলচ্চিত্রে তিনি নিজেকে ভেঙেছেন, গড়েছেন, নতুন করে সৃষ্টি করেছেন। বাঙালি দর্শক তাঁর মধ্যে খুঁজে পেয়েছে তাদের স্বপ্ন, তাদের প্রেম, তাদের বেদনা।
বিশেষত ‘নায়ক’, এই চলচ্চিত্র যেন উত্তমকুমারের শিল্পীসত্তার এক চূড়ান্ত উচ্চারণ। সত্যজিৎ রায়ের দূরদৃষ্টিতে তৈরি এই ছবিতে তিনি কেবল অভিনয় করেননি, তিনি যেন নিজেরই অন্তরকে উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। অরিন্দম মুখার্জির ভেতরে যে দ্বন্দ্ব, যে ক্লান্তি, যে আত্মসমালোচনা— তা যেন বাস্তবের উত্তমকুমারেরই প্রতিবিম্ব। এই ছবির অভিনয় দেখে বিদেশি শিল্পীরাও মুগ্ধ হয়েছিলেন। এলিজাবেথ টেলরের মতো বিশ্বখ্যাত অভিনেত্রী তাঁর অভিনয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন— এ এক বিরল সম্মান।
১৯৪৮ থেকে ১৯৮০— এই দীর্ঘ যাত্রায় তিনি অভিনয় করেছেন ২০০-রও বেশি ছবিতে। প্রতিটি ছবিই যেন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক একটি মণিমুক্তো। কেবল অভিনেতা হিসেবেই নয়, তিনি প্রযোজক, পরিচালক, সঙ্গীত পরিচালক, এমনকি গায়ক হিসেবেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ কিংবা ‘চিড়িয়াখানা’-য় তাঁর অভিনয় জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় তাঁর প্রাপ্তি ছিল মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন।
তবু এই দীপ্তিমান জীবনের ভেতরেও ছিল গভীর মানবিকতা। পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন ‘ভালো কাকু’। খ্যাতির শীর্ষে থেকেও তিনি ভুলে যাননি নিজের শেকড়কে। গিরীশ মুখার্জি রোডের বাড়িতে পাড়ার মুচির সঙ্গে তাঁর সহজ সম্পর্ক, কিংবা প্রতিবছর স্ত্রী গৌরীদেবীকে বেনারসি উপহার দেওয়ার আন্তরিকতা— এসবই তাঁকে মানুষের আরও কাছে এনে দেয়।
তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গেও ছিল অনন্য সম্পর্ক। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব, পারস্পরিক শ্রদ্ধা— বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। প্রতিযোগিতা নয়, সহাবস্থান— এই মূল্যবোধই তাঁদের শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। তবে জীবন তো সবসময় মসৃণ পথ নয়। সাফল্যের আড়ালে ছিল দুশ্চিন্তা, আর্থিক চাপ, ব্যক্তিগত টানাপোড়েন। তবু ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালে তিনি যেন সব ভুলে যেতেন। অভিনয় তাঁর কাছে ছিল সাধনা, এক প্রকার তপস্যা।
১৯৮০ সালের ২৩ জুলাই। ‘ওগো বধূ সুন্দরী’-র শুটিং চলছে। শরীর তখন ভালো নেই, তবু কাজ থেমে নেই। বুকের ভেতর ব্যথা নিয়েও তিনি শট দিচ্ছেন, সংলাপ বলছেন, একবারও থামছেন না। শিল্পীর এই দায়বদ্ধতা, এই নিষ্ঠা, তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। কিন্তু শরীর তো শেষ পর্যন্ত তার সীমা জানায়। শুটিং শেষে অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। ভর্তি করা হল বেলভিউ হাসপাতালে। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা সত্ত্বেও, ২৪ জুলাই রাতে তিনি চলে গেলেন, চিরতরে।
তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল কলকাতা। মানুষ যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না— তাদের প্রিয় নায়ক আর নেই। গিরীশ মুখার্জি রোডের সামনে ভিড় জমেছিল হাজার হাজার মানুষের। সেই দৃশ্য যেন এক যুগের অবসানের সাক্ষী।
তবু কি সত্যিই শেষ হয়ে গিয়েছে সেই যুগ? আজও তো টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর ছবি চললে দর্শক থমকে যায়। তাঁর চোখের দৃষ্টি, ঠোঁটের হাসি, সংলাপ বলার ভঙ্গি— সবই যেন আজও জীবন্ত। নতুন প্রজন্মও তাঁকে আবিষ্কার করে, ভালোবাসে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রের ভাষা বদলেছে, নায়কের সংজ্ঞা বদলেছে। ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এর যুগ এসেছে, নায়ক আরও কঠোর, আরও বাস্তব হয়ে উঠেছে। কিন্তু উত্তমকুমারের মতো প্রেমিক নায়ক, যিনি চোখের চাহনিতেই হৃদয় জয় করতে পারেন, তাঁর অভাব আজও অনুভূত হয়।
উত্তমকুমার কেবল একজন অভিনেতা নন, তিনি এক যুগের প্রতীক। তাঁর মধ্যে বাঙালি খুঁজে পেয়েছে তার স্বপ্ন, তার ভালোবাসা, তার সৌন্দর্যবোধ। তাই হয়তো তাঁর জন্মদিনের চেয়েও মৃত্যুদিনটি আমাদের বেশি নাড়া দেয়। এই দিনে আমরা শুধু একজন মানুষকে নয়, এক সম্পূর্ণ সময়কে স্মরণ করি।
শ্রাবণের বৃষ্টির মতোই তিনি আজও আমাদের জীবনে ফিরে আসেন— স্মৃতির ভেতর দিয়ে, গানের সুরে, চলচ্চিত্রের দৃশ্যে। হয়তো তিনি নেই, তবু তাঁর উপস্থিতি সর্বত্র। জীবনানন্দের সেই পঙক্তি মনে পড়ে— ‘এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর।’
উত্তমকুমার: শ্রাবণের আলো-আঁধারিতে এক অনন্ত নায়ক
ফাইল চিত্র
তবু বাঙালি ভাগ্যবান— কারণ সে একবার পেয়েছিল উত্তমকুমারকে। আর সেই প্রাপ্তিই তাকে আজও সমৃদ্ধ করে, আলো দেয়, আবেগে ভাসায়। শ্রাবণের এই দিন তাই শুধু শোকের নয়, এ এক অনন্ত স্মরণের, এক অমলিন ভালোবাসার দিন।