আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বড় জয় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এক বিরাট রাজনৈতিক ধাক্কা। নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট— কংগ্রেসের দুই কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। এই ফলাফল শুধু আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কিছুটা আসন হারায়। কিন্তু এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির পরাজয়ের ব্যাপকতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৯০ সালের পর প্রতিনিধি পরিষদে দলটির আসনসংখ্যা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেনেট, প্রতিনিধি পরিষদ এবং বিভিন্ন রাজ্যের গভর্নর নির্বাচনে ট্রাম্পের পছন্দের অধিকাংশ প্রার্থীও পরাজিত হয়েছেন। ফলে এই ফলাফলকে অনেকেই ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও তাঁর নীতির বিরুদ্ধে আমেরিকার জনগণের রায় হিসেবে দেখছেন।
নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগের বিষয় জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি এই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ওই সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। তার প্রভাব পড়েছে আমেরিকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। যুদ্ধের প্রতি মানুষের অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারে সংঘাত বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
এখন প্রশ্ন, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতে পাওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা কি সত্যিই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারবেন? একই সঙ্গে ইউক্রেনের চলমান সংকটের অবসান ঘটাতেও তাঁরা কি ভূমিকা নেবেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর শুধু আমেরিকার রাজনীতির জন্য নয়, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
ইজরায়েলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কও নির্বাচনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছিল। গাজায় প্যালেস্টাইনি জনগণের ওপর ইজরায়েলের সামরিক অভিযান এবং তার প্রতি ওয়াশিংটনের অব্যাহত সমর্থনের সমালোচনা করেছেন বহু ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। তাঁদের বক্তব্য, প্যালেস্টাইনি জনগণের মানবাধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আমেরিকার আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া উচিত। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এই নীতির ওপরও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ তাঁর দলের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। তবে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি। ফলে ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ গেলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্রুত অবসান হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে থাকায় ট্রাম্পের ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে কিছু বাধা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া এবং আমদানি-শুল্ককে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তাঁকে কংগ্রেসের বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা অবশ্য থাকছে। ফলে প্রশাসন ও কংগ্রেসের মধ্যে সংঘাত বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
ভারতের মতো দেশের কাছে এই পরিবর্তন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা এবং শুল্কসংক্রান্ত বিরোধের ক্ষেত্রে নতুন পরিস্থিতি কিছুটা সুবিধা তৈরি করতে পারে। কংগ্রেসের বিরোধিতা ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত করলে ভারতের মতো দেশ আরও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনায় বসতে পারবে। তবে আমেরিকার বাণিজ্যনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে, এমনটা এখনই বলা যায় না।
প্রশ্ন উঠছে, এই নির্বাচনী ফল কি আমেরিকার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সত্যিকারের পরিবর্তন আনতে পারবে? শুধু বিদেশনীতি নয়, অভিবাসন, বর্ণবিদ্বেষ এবং সামাজিক বিভাজনের মতো বিতর্কিত বিষয়েও কি নতুন দিশা তৈরি হবে? ট্রাম্পের রাজনৈতিক পরাজয় একটি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু সেই সুযোগকে বাস্তব পরিবর্তনে রূপ দিতে ডেমোক্র্যাটদের কতটা সদিচ্ছা ও সক্ষমতা রয়েছে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন
Image Source AI