মার্কিন ভিসা নীতি

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র

ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক বরাবরই বহুমাত্রিক— অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগ— সবকিছুর উপর দাঁড়িয়ে এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার নতুন ভিসা ও অভিবাসন নীতির পরিবর্তন এই সম্পর্কের এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। নয়াদিল্লিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিয়োর সফর সেই প্রেক্ষিতেই গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে ভারতের উদ্বেগ স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।

ভারতের বক্তব্য খুবই সরল এবং যুক্তিসঙ্গত। একদিকে অবৈধ অভিবাসন রোধে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে, এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় যেন বৈধ উপায়ে যাতায়াত, কাজ, পড়াশোনা বা গবেষণার সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিই ভারতের মূল প্রত্যাশা। কারণ ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি হলো এই ‘লিগ্যাল মোবিলিটি’—অর্থাৎ বৈধভাবে মানুষের চলাচল। হাজার হাজার ভারতীয় ছাত্র, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক এবং পেশাদার আমেরিকায় কাজ করছেন, যাঁরা দুই দেশের অর্থনীতি ও উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

এই প্রেক্ষিতে মার্কিন প্রশাসনের নতুন সিদ্ধান্ত— গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করতে বিদেশিদের নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা— ভারতীয়দের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। যদিও পরে এই নীতিতে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়েছে, তবুও অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে যাঁরা বহু বছর ধরে আমেরিকায় কাজ করছেন এবং গ্রিন কার্ডের দীর্ঘ অপেক্ষার তালিকায় রয়েছেন, তাঁদের জন্য এই পরিবর্তন উদ্বেগজনক।


পরিসংখ্যান বলছে, আমেরিকায় অনুমোদিত H-1B ভিসার প্রায় ৭১ শতাংশই ভারতীয়দের দখলে। অর্থাৎ উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের একটি বড় অংশই ভারত থেকে যায়। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু EB-2 এবং EB-3 ক্যাটাগরিতে গ্রিন কার্ড পাওয়ার জন্য বহু ভারতীয়কে দশকের পর দশক অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘসূত্রিতা নতুন নীতির ফলে আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

মার্কো রুবিয়ো অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, এই পরিবর্তন ভারতকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আমেরিকা একটি বড় অভিবাসন সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে গত কয়েক বছরে বিপুল সংখ্যক মানুষ অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করেছে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে একটি আধুনিক ও কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, এই পরিবর্তন একটি ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’, অর্থাৎ সাময়িক অস্থিরতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত একটি উন্নত ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ‘মপরিবর্তনের সময়কালের বোঝা কি বৈধ অভিবাসীরা বহন করবেন? যাঁরা নিয়ম মেনে, দক্ষতার ভিত্তিতে আমেরিকায় গিয়েছেন, তাঁদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে তা ন্যায্য হয় না। বরং এতে দুই দেশের মধ্যে যে আস্থা ও সহযোগিতা তৈরি হয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ। জয়শঙ্কর স্পষ্ট করে বলেছেন, অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু বৈধ যাতায়াতের ক্ষেত্রে সমস্যা যেন না হয়। কারণ এই মানবসম্পর্কই ব্যবসা, প্রযুক্তি ও গবেষণার ভিত্তি। যদি দক্ষ কর্মীরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কেও প্রভাব ফেলবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক পরিবেশ। রুবিয়ো স্বীকার করেছেন যে কিছু ক্ষেত্রে ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্য হয়েছে। যদিও তিনি এটিকে কিছু ‘অসচেতন’ মানুষের আচরণ বলে ব্যাখ্যা করেছেন, তবুও এই ধরনের প্রবণতা উদ্বেগের। কারণ অভিবাসন নীতি কঠোর হলে অনেক সময় সামাজিক মনোভাবও কঠিন হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে আমেরিকার মতো বহুসাংস্কৃতিক দেশের কাছে প্রত্যাশা থাকে আরও সংবেদনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আচরণ।

তবে এ কথা বলা যায়, ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক এখন এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজন, অন্যদিকে অভিবাসন নীতির পরিবর্তন সেই পথকে জটিল করে তুলছে। এই অবস্থায় দুই দেশেরই দায়িত্ব হলো সংলাপ ও সমঝোতার মাধ্যমে একটি ভারসাম্য খুঁজে বের করা।

আমেরিকা যদি সত্যিই ‘সবচেয়ে স্বাগতপূর্ণ দেশ’ হিসেবে নিজের পরিচয় ধরে রাখতে চায়, তাহলে তাকে এমন একটি অভিবাসন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষ ও বৈধ অভিবাসীদের জন্য সুযোগ বজায় রাখে। আর ভারতের পক্ষেও প্রয়োজন নিজের নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখা।
এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যের উপর— নিরাপত্তা বনাম সুযোগ, নিয়ন্ত্রণ বনাম উন্মুক্ততা। সঠিক সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, এই ‘ট্রানজিশন’ শেষ পর্যন্ত উন্নতির পথ দেখাবে, নাকি নতুন দূরত্ব তৈরি করবে।