মার্কিন তেলের শুল্ক, ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ

Photo: Magnific

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে শক্তিধর দেশগুলির সিদ্ধান্তের প্রভাব যে কত দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে, তা আবার স্পষ্ট হতে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত নতুন তেল-সম্পর্কিত আইনের মাধ্যমে। এই বিলটি পাশ হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এমন ক্ষমতা পাবেন, যার মাধ্যমে রাশিয়া ও ইরান থেকে তেল আমদানি করা দেশগুলির উপর অতিরিক্ত শুল্ক বা ট্যারিফ চাপানো যাবে। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের মতো একটি বড় অর্থনীতির দেশ যে সরাসরি চাপে পড়তে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

ভারত গত কয়েক বছরে তার জ্বালানি নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। ঐতিহ্যগতভাবে উপসাগরীয় দেশগুলির উপর নির্ভরতা কমিয়ে রাশিয়া থেকে তুলনামূলক সস্তা তেল আমদানি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার উপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়, তা ভারত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগায়। ফলে দেশের জ্বালানি খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তি।

কিন্তু মার্কিন এই নতুন বিল সেই নীতিকে বড়সড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই এই ট্যারিফ আরোপ করে, তাহলে ভারতের জন্য রাশিয়ান তেল আমদানি ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন খরচ এবং শিল্প উৎপাদনের উপর। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব অনিবার্যভাবে পড়বে।


এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেন এই পথ বেছে নিচ্ছে? একদিকে তারা রাশিয়া ও ইরানের উপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়, অন্যদিকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও রক্ষা করতে চাইছে। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন আগেও দেখিয়েছে যে তারা নিষেধাজ্ঞার চেয়ে শুল্ককে বেশি কার্যকর অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে আগ্রহী। কিন্তু এই নীতি যে সবসময় কার্যকর হয় না, তার উদাহরণও রয়েছে। অতীতে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করতে গিয়ে ১০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল।

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কও এই প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে। একসময় দুই দেশের মধ্যে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল, তা সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা শীতল হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। বাণিজ্য চুক্তি এখনও চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়নি, এবং এই নতুন বিল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কূটনৈতিক সৌজন্য ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক দিয়ে এই ফাঁক পূরণ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

তবে ভারতের সামনে পথ একেবারে বন্ধ নয়। অতীতে যেমন সংকটের সময় দেশ বিকল্প পথ খুঁজে নিতে পেরেছে, এবারও তেমন সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করা, নবীকরণযোগ্য শক্তির উপর জোর বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা— এই তিনটি দিক এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে ভারতের উচিত এই পরিস্থিতিকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা। বিশ্ব রাজনীতিতে নির্ভরতার ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় স্বনির্ভরতা এবং বহুমুখী অংশীদারিত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। শুধু সস্তা তেল পাওয়ার সুযোগের উপর নির্ভর করলে চলবে না, বরং একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ জ্বালানি নীতি গড়ে তুলতে হবে।

মার্কিন এই প্রস্তাবিত আইন শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সংকেত। এর প্রভাব ভারতসহ বহু দেশের উপর পড়তে পারে। তাই আবেগ নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই এখন প্রয়োজন। ভারতের জন্য এটি একদিকে যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি অন্যদিকে নতুন কৌশল নির্ধারণের একটি সুযোগও বটে।