ইউপিআই: বিনামূল্যের যুগের পর

File Photo

ভারতে ডিজিটাল লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। একসময় ডিজিটাল পেমেন্ট বলতে মূলত বড় দোকান, শপিং মল কিংবা অপেক্ষাকৃত সচ্ছল মানুষের ব্যবহারের একটি ব্যবস্থা বোঝাত। ইউপিআই সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের প্রসারের সঙ্গে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার আওতায় আসা বিপুল সংখ্যক মানুষকে যুক্ত করে ইউপিআই ডিজিটাল লেনদেনকে পৌঁছে দিয়েছে দেশের প্রায় সর্বত্র। চায়ের দোকান থেকে সবজি বাজার— অতি সামান্য অঙ্কের লেনদেনও এখন কয়েক সেকেন্ডে সম্ভব।
এই সাফল্যের পিছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ইউপিআই ব্যবহারের জন্য সাধারণ মানুষের কাছে কোনও অতিরিক্ত খরচ না থাকা। এখন সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, ইউপিআই ব্যবহারে সর্বত্র সাধারণ মানুষকে টাকা দিতে হবে। ব্যক্তি থেকে ব্যক্তির লেনদেন এবং নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ব্যক্তি বা ব্যবসায়ীর মধ্যে লেনদেন আগের মতোই বিনামূল্যে থাকবে। নিয়মিত কিছু পেমেন্ট ব্যবস্থাও এর বাইরে থাকবে। মূলত নির্দিষ্ট ধরনের বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর চালু হবে।
এই পরিবর্তনকে শুধু ‘ইউপিআইয়ের উপর চার্জ বসানো’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এর সঙ্গে অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যতের ডিজিটাল পরিকাঠামোর প্রশ্নও জড়িত।
প্রথমত, কোনও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন যখন ব্যাপক সাফল্য অর্জন করে, তখন তার ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য অর্থের প্রয়োজন হয়। ইউপিআই ইতিমধ্যেই একটি বিশাল পরিকাঠামোয় পরিণত হয়েছে। এই ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, দ্রুত এবং সর্বসাধারণের উপযোগী করে তুলতে বিনিয়োগ দরকার। ইউপিআই থেকে সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ যদি ছোট ব্যবসায়ী ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত উন্নয়নে ব্যবহার করা হয়, তা হলে তার একটি জনকল্যাণমূলক যুক্তি রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ইউপিআই পরিষেবা চালু থাকার ফলে অন্যান্য পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও একটি অসমতা তৈরি হয়েছিল। কারণ, অনেক পুরনো পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মকে শুরু থেকেই লেনদেনের উপর নির্দিষ্ট ফি দিতে হয়েছে। ইউপিআইয়ের জনপ্রিয়তা সেই ব্যবধান আরও বাড়িয়েছে। নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে এমডিআর চালু হলে প্রতিযোগিতার পরিবেশ কিছুটা ভারসাম্যপূর্ণ হতে পারে।
তবে এখানেই তৃতীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। ইউপিআই ব্যবস্থায় কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলি এই পরিবর্তন থেকে কতটা লাভবান হবে? বিশেষ করে যেসব সংস্থায় বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। একটি জনপরিকাঠামো হিসেবে ইউপিআইয়ের সাফল্যের সুফল যেন কেবল কয়েকটি বড় বেসরকারি সংস্থার হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও স্বাভাবিক। বিরোধীরা মূলত বেসরকারি সংস্থার সম্ভাব্য লাভ এবং এতদিনের বিনামূল্যের ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দিকটি সামনে এনেছে। সেই উদ্বেগ একেবারে অমূলক নয়। আবার এটাও মনে রাখা প্রয়োজন, ইউপিআইয়ের বড় একটি অংশের লেনদেন এখনও বিনামূল্যেই থাকবে। ফলে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ছোটখাটো ডিজিটাল লেনদেনের উপর সরাসরি অতিরিক্ত বোঝা পড়ার সম্ভাবনা সীমিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইউপিআইকে এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে উদ্ভাবন, প্রতিযোগিতা এবং জনস্বার্থ— তিনটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে। বিনামূল্যে পরিষেবা জনপ্রিয়তা বাড়াতে সাহায্য করেছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে একটি বিশাল প্রযুক্তিগত পরিকাঠামো চালানো এবং উন্নত করার জন্য স্থায়ী আর্থিক ভিত্তিও প্রয়োজন। তাই ইউপিআইয়ের নতুন মূল্য কাঠামোর সাফল্য নির্ভর করবে সংগৃহীত অর্থ কোথায় এবং কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে তার উপর।
স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া গেলে এই পরিবর্তন কেবল রাজস্ব সংগ্রহের ব্যবস্থা হয়ে থাকবে না; ভবিষ্যতের আরও উন্নত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার ভিত্তিও তৈরি
করতে পারে।