ভারতে বসবাসকারী প্রতিটি মানুষ ভারতীয়। এই বিশাল ও বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড সবার জন্মভূমি। বহুত্ববাদী এই দেশের মূল শক্তি হলো ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’। ভারতের সংবিধান প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিককে নিজের নিজের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালনের মৌলিক অধিকার দিয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, ধর্ম এবং দেওয়ানি বিধি সম্পূর্ণ এক বিষয় নয়। যে কোনও সমাজ পরিচালনায় আইন এবং ধর্ম— উভয়েরই ভূমিকা অপরিসীম। তবে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার উদ্ভব, এই দুটি ধারণাকে দুটি ভিন্ন ধারায় বিভক্ত করেছে। আপাতদৃষ্টিতে অনেকের মনে হতে পারে ধর্মীয় নিয়ম-নীতিই বুঝি আইনের মূল ভিত্তি, কিন্তু গভীর দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, দেওয়ানি আইন এবং ধর্মীয় অনুশাসন, তাদের উৎস, উদ্দেশ্য এবং প্রয়োগরীতির দিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
ধর্মীয় বিধিনিষেধের মূল উৎস হলো ঐশ্বরিক বাণী, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মীয় অবতার ও সংস্কারকদের নির্দেশ। এগুলোর মধ্যে কিছু কিছু পরিবর্তনীয়, কিন্তু সবটাই মূলত বিশ্বাসভিত্তিক। অন্যদিকে রাষ্ট্র, সংসদ বা সংবিধানের মাধ্যমে দেওয়ানি আইন প্রণীত হয়। এটি জনগণের সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার সুরক্ষার জন্য তৈরি হয় এবং সময় ও বাস্তবতার প্রয়োজনে এতে সংশোধন আনা হয়। ধর্মের মূল উদ্দেশ্য মানুষের আত্মিক উন্নতি, ব্যক্তিগত নৈতিকতা গঠন এবং পরকালের মুক্তি। এটি প্রধানত মানুষের ভিতরের বিবেক ও বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে দেওয়ানি আইনের মূল লক্ষ্য সমাজে শৃঙ্খলা রক্ষা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং বিরোধ মিটানো। উত্তরাধিকার, বিবাহ, সম্পত্তি হস্তান্তর, চুক্তি, ঋণ পরিশোধ, বাণিজ্যিক লেনদেন বা ক্ষতিপূরণের মতো বাস্তব ও সামাজিক বিষয়গুলো দেওয়ানি আইনের আওতাভুক্ত।
প্রত্যেক ধর্মের মূল কথাই হলো ঈশ্বরের আরাধনা এবং মানবকল্যাণ। তবে কালক্রমে আরাধনার পদ্ধতির পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন জীবন পরিচালনার জন্য কিছু সামাজিক আচার-আচরণ, নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং পারিবারিক আইনও ধর্মের অংশ হয়েছে। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার কিংবা দত্তক গ্রহণের মতো সম্পূর্ণ সামাজিক বিষয়গুলো ধর্মের মোড়কে বন্দি হয়েছে। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, প্রাচীন বা মধ্যযুগের সমাজে উচ্চবর্গীয় এবং গোঁড়া কট্টরপন্থী কিছু মানুষ নিজেদের আধিপত্য ও কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখার জন্য এই সমস্ত নিয়ম তৈরি করেছিলেন। পরবর্তী কালে ধর্মীয় আইনের তকমা দিয়ে এগুলোর সামাজিক মান্যতা আদায় করা হলেও, আধুনিক যুগে এসে এগুলো তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অজস্র কুসংস্কার এবং নারীদের প্রতি চরম বৈষম্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অতীতে হিন্দু আইনে নারীদের সম্পত্তির অধিকার এবং স্বাধীন ইচ্ছার পরিধি অত্যন্ত সীমিত ছিল, যা পরবর্তী কালে আইনি সংস্কারের মাধ্যমে বদলানো হয়েছে। একইভাবে অন্যান্য কিছু ধর্মীয় আইনেও বিবাহবিচ্ছেদ বা ভরণপোষণের ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার দৃষ্টান্ত দেখা যায়। ধর্মের দোহাই দিয়ে তৈরি এই আলাদা আলাদা দেওয়ানি বিধি ভারতীয়দের মধ্যে এক অদৃশ্য বিভেদ তৈরি করে রেখেছে, যা জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী।
ভারতের সংবিধানের ৪৪ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রীয় নির্দেশমূলক নীতির অংশ হিসেবে দেশজুড়ে একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চালু করার কথা বলা হয়েছে। আজ স্বাধীনতার ৭৯ বছর পার হতে চলল। এতগুলো বছর পরও দেশের সব নাগরিকের জন্য একই দেওয়ানি আইন না থাকাটা দুঃখজনক। এখন সময় এসেছে সমগ্র দেশের জন্য একটি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি প্রণয়ন করার। তবে এই আইন চাপিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়, বরং এটি হওয়া উচিত একত্রীকরণের প্রক্রিয়া। এর জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। এই কমিটি ভারতের প্রতিটি ধর্মের ব্যক্তিগত আইনগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করবেন এবং কোনও বিশেষ ধর্মের মধ্যে যদি সমাজ ও মানবকল্যাণের জন্য ইতিবাচক বা ভালো কোনও নিয়ম থাকে, তবে তা অভিন্ন দেওয়ানি বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করবেন।
এই প্রসঙ্গে দেশের জনজাতি বা আদিবাসী সমাজকেও এই অভিন্ন বিধির আওতায় আনা প্রয়োজন। ভারতের মূল ভূখণ্ডের সংস্কৃতিতে জনজাতিদের অবদান অনস্বীকার্য হলেও, ভৌগোলিক ও সামাজিকভাবে তাঁরা দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থেকেছেন। তাঁদের নিজস্ব প্রথাগত আইনের মধ্যে অনেক ভালো দিক যেমন আছে, তেমনই কিছু কুসংস্কারও রয়ে গেছে। তাঁদের পিছিয়ে রেখে বা মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন রেখে দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। স্বাধীনতার এই দীর্ঘ সময় পর, জনজাতিভুক্ত ভাইবোনদেরও সমাজের মূলধারায় শামিল করার এটাই সঠিক সুযোগ।
একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধর্ম ও বিশ্বাসের মানুষ একত্রে বসবাস করে। সেখানে ধর্মীয় অনুশাসন মানুষের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে, কিন্তু সর্বজনীন সামাজিক ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিরপেক্ষ ও অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কোন বিকল্প নেই। আইন ও ধর্মের এই পার্থক্যকে স্পষ্ট রাখাই একটি সুষ্ঠু ও সুশাসিত সমাজ গঠনের পূর্বশর্ত। একটি বৈষম্যহীন এবং আধুনিক সমাজ গঠনে আইনের সমতা অপরিহার্য। দেশের সমস্ত নাগরিক যখন জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গ নির্বিশেষে একই দেওয়ানি আইনের ছাতার তলায় আসবেন, তখন পারস্পরিক দূরত্ব ঘুচে যাবে। অভিন্ন দেওয়ানি আইন ভারতের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও সুদৃঢ় করবে।